চলছে সহিংস অবরোধ : পুড়ছে দেশ : আতঙ্কিত জনগন

4 (1)প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: চলছে অবরোধ। পুড়ছে দেশ। মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সহিংসতা। গত নয় দিন ধরে বিরোধী জোটের এ অবরোধ-হরতালের নাশকতায় আতঙ্কিত গোটা দেশ। রাজনৈতিক সংকট আর সন্ত্রাস-সহিংসতা-নৈরাজ্যের নৃশংসতার শিকার হয়ে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ আর সন্ত্রাসে মানুষের আর্তচিৎকার যেন বন্ধই হচ্ছে না। জ্বলছে গণপরিবহন, যানবাহন আর নিরীহ মানুষের সহায়-সম্পদ। পণ্য পরিবহন আর যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

 অবরোধ-হরতাল ডেকে নিরীহ মানুষ হত্যার ভয়ঙ্কর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজন। তারা বলেছেন, দেশ আজ স্বার্থান্ধ রাজনীতির বেড়াজালে। প্রিয় মাতৃভূমি বুকভরে যেন নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না। বোমা-আগুনের ভয়ে মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে গভীর উৎকণ্ঠায়। ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের হত্যাযজ্ঞের ভয়ঙ্কর দিনগুলো যেন ফিরে আসছে। যারা দাবি আদায়ের জন্য মানুষ হত্যার দুঃস্বপ্নের খেলায় মেতেছেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তারা বলেছেন, বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করার অধিকার দিতে হবে। আলাপ-আলোচনায় সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশিষ্টজন রংপুরে গভীর রাতে বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে চারজন নিরীহ মানুষ হত্যার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, অবিলম্বে এই নৃশংসতা বন্ধ করতেই হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, অবরোধের নামে যা হচ্ছে তা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটা সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যাকাণ্ড। একজন নাগরিক হিসেবে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, আজ সাধারণ মানুষের পক্ষে কেউ নেই। প্রতিদিন অবরোধের নামে আগুন ও পেট্রোল দিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিসম্পদ বিনষ্ট করা হচ্ছে। তারা এভাবে সন্ত্রাস ও সহিংস ঘটনা ঘটাবে আর সরকার বসে বসে দেখবে। এমন সরকার আমরা চাই না। সরকারকে কঠোর হস্তে সন্ত্রাস দমন করতে হবে। জনগণকে নিরাপত্তা দিতে হবে। বন্ধ করতে হবে নৃশংসতা। যে সরকার জনগণ ও তার জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে সেই সরকারের প্রয়োজন নেই।

ড. মিজান বলেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান গুলিতে আহত হলেন, আর বিদেশিরা চিৎকার শুরু করলেন। বিবৃতি দিয়ে ওলট-পালট করে ফেললেন। প্রতিদিন যে আগুন দিয়ে, পেট্রোল দিয়ে নিরীহ মানুষ মারা হচ্ছে, সে ব্যাপারে কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই। তার মতে, সহিংসতা ও রাজনৈতিক আন্দোলন একসঙ্গে চলতে পারে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, সরকারি ও বিরোধী দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় তিনি অন্তত দেখছেন না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল গতকাল এক বিবৃতিতে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির কারণে প্রাণহানিসহ জনজীবনের চরম দুর্ভোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে অথবা আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কারণে মানুষের মৃত্যু, বিরোধীদলীয় উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিচারপতি ও সরকারি কর্মচারীদের বাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগ এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়েরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে সুলতানা কামাল বলেন, বুধবার রংপুরে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে শিশু-নারীসহ চারজনকে পুড়িয়ে হত্যা করাসহ ৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাত-সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১০ দিনে ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা অচলের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ, হয়রানি এবং অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সমর্থকদের চোরাগোপ্তা হামলার কারণে জনমনে বিরাজ করছে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা। অন্যদিকে, বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে না দেওয়া, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়, সংবাদমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের অধিকারকে অগণতান্ত্রিকভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।অবিলম্বে এ অবস্থার অবসান দাবি করে সুলতানা কামাল বলেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি সবার গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্ষা করা এবং বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশে বাধা প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোকেও যে কোনো ধরনের সহিংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতন্ত্রের নামে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বলপ্রয়োগের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফলে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। সর্বত্রই আজ নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় মানুষ দিন পার করছে। তিনি বলেন, এক পক্ষ ক্ষমতায় থাকতে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের নামে সহিংসতা চালানোর পরিণাম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বুঝতে হবে। গণতন্ত্রে যেসব করার কোনো সুযোগ নেই, গণতন্ত্রের নামে তারা সে আচরণই করছে। এতে ক্রমে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাই প্রকাশ পাচ্ছে। আন্দোলন এবং আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কখনই সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অবরোধ-হরতালের কারণে দেশজুড়ে সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো ও মানুষের জানমালের ক্ষতি করা এসবের যা কিছু ঘটছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এগুলো দ্রুততার সঙ্গে বন্ধ করার পাশাপাশি যারা এর সঙ্গে যুক্ত, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়াটা জরুরি। একই সঙ্গে এগুলো কেন ঘটছে, তার কারণ উদ্ঘাটন করে এর প্রতিকারের উপায়ও বের করা দরকার। সভা-সমাবেশ ও কথা বলার মতো জনগণের মৌলিক, সাংবিধানিক ও জন্মগত অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী জোটকেও সভা-সমাবেশ করার অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *