পবিত্র কুরআন দিয়ে তাবলীগ করলে বাতিলের সাথে বিরোধ লাগবেই

abdul kahhar 01মুহাম্মদ আবদুল কাহহার: আরবি তাবলীগ শব্দের অর্থ প্রচার, ঘোষণা, দ্বীনী দাওয়াত ইত্যাদি। সকল নবীরা ইসলাম প্রচারে দাওয়াতী কাজ করেছেন। তারই ধারাবাহীকতায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ স. এর নবুওয়্যাত লাভের পর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু হওয়ার আগে গোপনে তিন বছর ইসলাম প্রচার করেন। মহানবীর নিকটাত্মীয়, ঘনিষ্ঠজন, প্রতিবেশী, বন্ধু–বান্ধব, চেনা-জানা পরিচিত লোকদেরকে সর্বপ্রথম দাওয়াত দিয়েছেন। কারণ মহানবী স. সম্পর্কে তাঁর প্রতিবেশীরা ভাল জানেন। প্রত্যেক দায়ীর উচিত নিজ নিজ এলাকা থেকে দাওয়াতী কাজ শুরু করা। অথচ আমাদের সমাজের দা’য়ীরা নিজ এলাকার পরিবর্তে অন্য এলাকাতেই দাওয়াত দিয়ে থাকেন যা অনুচিত। প্রতিবেশীর হককে অগ্রাধীকার দেয়া দরকার। মহানবীর দাওয়াতের ফলে একত্ববাদে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা ধীরে-ধীরে বাড়ার ফলে তৎকালীন কুরাইশ বংশ সহ ইসলামের বিরোধীরা রাসূলের তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠলো। অমানুষিক নির্যাতনের পথ বেঁছে নিল।

আল কুরআনের ৫৫ টির অধিক নামের একটি নাম আল ফুরকান (সত্য মিথ্যার প্রভেদকারী)। কুরআন দিয়ে তাবলীগ করলে বাতিলের সাথে বিরোধ লাগবেই। যে কারনেই নবী-রাসূল, সাহাবী, মুমিন, ইসলামী দলগুলোর কর্মী, সাধারণ মুসলিমদের উপর যুলুম-নির্যাতন, জেল-জরিমানা ইত্যাদি ঈমানী পরীক্ষার অংশ মাত্র। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন প্রচলিত তাবলীগ জামায়াত কিংবা শুধুই মসজিদ ভিত্তিক প্রচলিত তাবলীগ জামায়াত। দৃঢ়চিত্তে পাঠকদের বলতে চাই, আমি তাবলীদের বিরুদ্ধে নই তবে প্রচলিত তাবলীগ জামায়াতের সাথে ইসলামের সাথে যে অসঙ্গতি আছে সেটা তুলে ধরা উদ্দেশ্য। ঈমানি দূর্বলতাকে কৌশল বলা ঠিক নয়। মহনবীর চেয়ে কেউ কৌশলী ছিলেন না। তিনি বাতিলের সাথে সখ্যতা করে বা আতাঁত করে চলা শিখিয়ে যাননি। ন্যয় ও অন্যায় পৃথক করে দেখেছেন। বাংলাদেশে নামাজী ও রোজাদার লোকের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু যাকাত দেয়া ও সত্যকথা বলার লোক নগন্য। ইসলাম কাযেম হোক সেটা সবাই চায় তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন হোক এমন লোকের সংখ্যা হাতেগোনার মতো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেভাবে এক হতে পারি তেমনি ইসলামি চেতানায় এক হওয়া দরকার।

আমাদের তাবলীগের মতো বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী গোটাবিশ্বে তাবলীগের কাজ করলেও বাতিলের সাথে বাতিলের সাথে লড়াই হচ্ছেনা। বাতিলের সাথে কেন আপোষ করা হচ্ছে? লক্ষণীয় যে ইসলামী আন্দোলনের পথ তো ফুলের বিছানা নয়! বিশ্ব ইজতেমায় প্রতি বছর দেশ-বিদেশী লক্ষ লক্ষ লোক জমায়েত হয়। অথচ ইসলামের উপর আঘাত আসার পরেও তাদেরকে নিষ্ক্রীয় থাকতে দেখা যায়। দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় তাদের ভূমিকা না থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন। কুরআন সুন্নাহ বিরোধী কোন কর্মকান্ডের বিরোধীতাতো দুরের কথা সামান্য সমালোচনা কিংবা কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়না। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তাবলীগ জামায়াত যদি পরিপূর্ণ সত্যের উপরই থেকে থাকেন তাহলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডে তাদের সম্পৃক্তা নেই কেন? নাস্তিক লতিফ সিদ্দিকী হজ্জ ও তাবলীগ জামায়াতের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করলেও এ সংগঠনটির অচেতনভাব দৃশ্যমান। দেশের অধিকাংশ মানুষ আজ অন্যায়ের সাথে জড়িত আছে। নগ্নতা, যৌন হয়রানি, আকাশ সংস্কৃতির নগ্নতা, বেহায়া, বেল্লাপনা, ভালবাসা দিবস পালন, পতিতাবৃত্তি, ভ্রাম্যমান যৌনকর্মী, সুদ, ঘুষ, ছিনতাই, মাদক দ্রব্যে ছয়লাব, গুম, খুন, হত্যা, ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, রাষ্ট্রীয় জুলুম চলছে। কেন তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেনা? সাধারণ মানুষ তাদের থেকে ভাল কিছু আশা করলেও যথারীতি নিরাশ! ইসলাম বৈরাগ্যকে পছন্দ করেনা। ঘরবাড়ি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে বাদ ইসলাম কায়েমের চেষ্টা অর্থহীন। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠী একবার আল্লাহু আকবার ধ্বনী তুললে বাতিল শক্তিরা আতঙ্কে থাকতো। অন্যায়ের আপোষ করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

ইসলাম বিরোধী সকল চক্রান্ত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য নবী-রাসূলদের উত্তরসূরী হিসেবে একটি দলকে দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক হোক, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে, আর তারাই সফলকাম।(আল ইমরান-১০৪)। আদেশ এবং অনুরোধ দুটি পৃথক শব্দ। কুরআনে বার বার বলা হয়েছে, অন্যকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য। অথচ যারা নবীওয়ালা কাজ করেন বলে দাবী করেন, তারা কেন আদেশের পরিবর্তে অনুরোধ করছেন? আদেশ করতে হলে ক্ষমতার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা না থাকলে আদেশ ও নিষেধ করার অধিকার থাকেনা। মহানবী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, খোলাফায়ে রাশেদীনরা ৩০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ইসলাম রাজনীতি করার অনুমতি দিয়েছে, অথচ এক শ্রেণীর মানুষ তাদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য ইসলামে রাজনীতি নেই বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

তাবলীগ হবে ইসলামের দিকে, কোরআন ও সূন্নাহর মাধ্যমে। কোরআন সূন্নাহকে দাওয়াতের মূল গাইডলাইন মনে না করে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো অসংখ্য জাল ও দূর্বল হাদিস নিয়ে শুধুমাত্র ফজিলতকে সামনে রেখে রচিত বই দিয়ে দাওয়াতী কাজ করলে তা কখোনই হকের পথে পরিচালনা করতে পারেনা। কোরআন দিয়ে তাবলীগ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে রসূল , পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ (কুরআন) হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌছালেননা। (সূরা মায়েদাহ : ৬৭)।

অনেক আশো নিয়ে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশ থেকে জামায়াত আসে। বিশ্ব ইজতেমাকে কেউ কেউ দ্বিতীয় হজ্জ বলে জানেন, পবিত্র হজ্জের পরেই বিশ্ব ইজতেমার স্থান বলে জনমনে স্বীকৃত। অনেকে সঠিক জেনেও প্রকাশ করছেন না। এরকম জঘন্য ভুল ধারণা থেকে সচেতন ও সংশোধন হওয়া দরকার। সেই ইজতেমা থেকে একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা পেলে কিংবা দিক নির্দেশনা পেলে গোটাদেশ স্বস্তিতে নি:শ্বাস ফেলতে পারতো। বিশ্ব মুসলিমরা পথ নির্দেশনা পেত। কিছু কিছু একঘুঁয়ের কারণে তুরাগ তীরে ইজতেমায় আগত মুসুল্লিরা হতাশ হয়ে ফিরে যান। ইজতেমা শেষে যে মোনাজাত পরিচালনা করা হয় তাকে আখেরী মোনাজাত বলা হয়। বিশ্ব এজতেমার শেষ দিনের সম্মিলিত মোনাজাত কে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয় এ রকম গুরুত্ব যদি ফরজ ইবাদতগুলো সহ পাঞ্জেগানা নামাজের জন্য দেয়া হতো তাহলেই ইসলামী বিধানাবলী প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভুমিকা রাখতে পারতো। ফরজ সালাতে মসজিদে যায় না নফল নামাজে হাজির, ফরজ বিষয়ে গুরুত্ব নেই মোনাজাত ও মিলাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি। রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যায় বন্ধ হোক-এ বিষয়ে তাদের কোন কর্মসূচী নেই, কিন্তু কেন? তরুণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এটাই ঈমানের দাবী, ওমরের মতো ভুমিকার পরিবর্তে দাওয়াতী কাজের নামে তরুণ এমন শিক্ষা পায় সে যেন সদ্য প্যারালাইসেসে আক্রান্ত হয়েছেন, এমনটি কাম্য নয়। এভাবে নানাবিধ বিষয় আমাদের ভেবে দেখা দরকার। বিশ্ব ইজতেমা থেকে আমাদের অর্জন হয়! তাবলীগ জামায়াতের সফলতা কি শুধুই বিশ্ব ইজতেমা। নবীদের তাবলীগ ও প্রচলিত তাবলীগ জামায়াতের মিল-অমিল আমাদের খুঁজে দেখা দরকার। আল কোরআন দিকে দাওয়াত দেয়া প্রয়োজন। অনুরোধ নয়। “সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ” করার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুসলিমরা ফিরে পাক এটাই বিশ্ব মানবতার শ্লোগান। মহান আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি। আমীন। লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, গজমহল ট্যানারী উচ্চ বিদ্যালয়, হাজারীবাগ, ঢাকা -১২০৯

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *