সফল নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর

সলিম আহমদ: হেলেনা জাহাঙ্গীর। একজন সফল নারী উদ্যোক্তার নাম। কিশোর বয়স থেকেই যার স্বপ্ন ছিল কিছু একটা করবেন। কিন্তু তা আর হলনা। বসতে হলো বিয়ের পিড়িতে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আজ তিনি এক ছেলে এবং দু’টি কন্যা সন্তানের জননী। বড় ছেলে জাহেদুল আলম জয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছেন। আর দুই কন্যার মধ্যে জাফরিনা আলম জেসি ‘ও’ লেভেল এবং হোমায়রা আলম জেনি কেজি টু’তে পড়ছেন। তিনি বিয়ের পর থেকে সংসাসের সব কাজ করার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এমনকি নিজের স্বামীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও চাকরি করার সিদ্বান্ত নেন। পরে অবশ্য মত পাল্টে ছোট্ট পরিসরে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসায় পা রাখেন। সেই থেকে শুরু করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সফল নারী উদ্যোক্তা। হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হক শরীফ সমাজের একজন উচ্চশ্রেণীর মানুষ। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। আর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম শুরু থেকেই ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণের পথে যাত্রা করেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। সেই যাত্রা থেকে আজ অবধি তিনি এ ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। তাইতো স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে তাদের এখনকার পোষাক ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর মূলত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেকে সফল করেছেন বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে। তিনি একাধারে নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড ও জে সি এ অ্যামব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি একটি ম্যাগাজিনের সাথে তার সফলতা, কাজের দক্ষতা, দেশের পোষাক খ্যাতের ব্যবস্হাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। আমরা পাঠকদের জন্য হেলেনা জাহাঙ্গীরের সেই সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরলাম।     প্রশ্ন : ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আপনার কি কি চিন্তা রয়েছে?  হেলেনা জাহাঙ্গীর : আমি মনে করি, আমাদের অঙ্গনের শিল্পকে রক্ষনাবেক্ষণে সবার আগে প্রয়োজন শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা। তাদের ন্যায্য বেতনাদি প্রদানের পাশাপাশি বোনাস ঠিকঠাক মতো প্রদান করা উচিত। যা আমরা করেও আসছি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নানা অভিযোগ আসছে, সবাই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মনোযোগী নয়। সামাজিক অন্যায়ের কবলে পড়তে হয় অনেক সময়। এখানে বলতে চাইছি, দেশের নীতি-নৈতিকতাহীন যুব সমাজের চাঁদাবাজি মোকাবিলা করতে হয়। যার অভিজ্ঞতা কোনো কোনো সময় সুখকর হয় না। বায়ার চায়, শ্রমিকের অধিকার যেন নিশ্চিত থাকে, যে কোনো পর্যায়ের সংকট মোকাবিলা করার সাধ্যি থাকে। আপনারা জানেন, তাজরীনসহ বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ব্যবসায় নানা ধরনের ক্রান্তিকালীন প্রেক্ষিতের অবতারণা হয়েছে। অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে এই খাতের ব্যবসাকে সকলের জন্য অর্থাৎ মালিক পক্ষ, বায়ার, শ্রমিককে সুবিধাভোগী করতে চাইলে সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে। আর আমরা তা করে আসছি।প্রশ্ন: দেশ সম্পর্কে কি ভাবনা?  হেলেনা জাহাঙ্গীর : ৪৩ বছরের লাল-সবুজের বাংলাদেশ ছেড়ে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। পেশাগত, পারিবারিক কিংবা অভিজ্ঞতার পুঁজি সমৃদ্ধগত কারণে হয়তো দেশ-বিদেশে ঘুরেছি। কিন্তু কখনো মনে হয়নি যে, বাংলাদেশ ছেড়ে অন্যত্র স্থায়ীভাবে বসবাস করি। মন পড়ে থাকে এই বাংলায়। নানা সময়ের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় আমরা হয়তো উচ্চ মানের দেশ হতে পারিনি। কিন্তু দেশ এগুচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে উন্নত দেশ হবে। তার জন্য দরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা শাসক শ্রেণীর উন্নত ভিশন ও মিশন। আমরাতো রয়েছিই। সরকার ও বেসরকারি সমন্বয়ে আমরা যে কোথায় যেতে পারি তা মাঝে মাঝে আমি ভাবি। আমি বিশ্বাস করি, সুশাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত হলে আমরাই বদলে দিতে পারি এই দেশটাকে।

প্রশ্ন: রাজনীতিতে আসবেন কী-না? হেলেনা জাহাঙ্গীর : খুব সম্ভবত বৃহৎ কিছু করতে হলে রাষ্ট্রের নিবন্ধনধারী কেউ হতে হয়। আমি বলতে চাইছি, রাজনৈতিক অবয়বে তখন কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু রাজনীতিকে এখনো ‘না’ বলে আসছি। সমাজ পরিবর্তনে সামাজিক আন্দোলনের মাঝেও কিন্তু বড়সড় বিবর্তন আনা সম্ভব। সভ্যতার ক্রমবিকাশে পুঁজি, ক্ষমতা সারা বিশ্বে সার্বজনীন প্রভাবিত ব্যবস্থা হলেও ‘মানবের তরে সঁপে দেয়া’ সাধারণ তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়েও কিন্তু আমরা কম বেশি ভূমিকা রাখতেই পারি। আমার সামাজিক পথচলায় অনেকেই আমাকে ‘দলনেত্রী’ ‘আয়রন লেডি’ বলে সম্বোধন করে। আমি আবার এও বলছি না, আদৌ আমাকে রাজনীতিতে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে না!

প্রশ্ন: রাজনীতিতে আসবেন কী-না? হেলেনা জাহাঙ্গীর : খুব সম্ভবত বৃহৎ কিছু করতে হলে রাষ্ট্রের নিবন্ধনধারী কেউ হতে হয়। আমি বলতে চাইছি, রাজনৈতিক অবয়বে তখন কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু রাজনীতিকে এখনো ‘না’ বলে আসছি। সমাজ পরিবর্তনে সামাজিক আন্দোলনের মাঝেও কিন্তু বড়সড় বিবর্তন আনা সম্ভব। সভ্যতার ক্রমবিকাশে পুঁজি, ক্ষমতা সারা বিশ্বে সার্বজনীন প্রভাবিত ব্যবস্থা হলেও ‘মানবের তরে সঁপে দেয়া’ সাধারণ তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়েও কিন্তু আমরা কম বেশি ভূমিকা রাখতেই পারি। আমার সামাজিক পথচলায় অনেকেই আমাকে ‘দলনেত্রী’ ‘আয়রন লেডি’ বলে সম্বোধন করে। আমি আবার এও বলছি না, আদৌ আমাকে রাজনীতিতে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে না!

প্রশ্ন: বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের নারীদের আপনি কীভাবে দেখছেন? হেলেনা জাহাঙ্গীর : দেখুন, বাঙালি নারী লড়তে জানে। পল্লী জীবনের গ্রামীণ মেঠোপথ থেকে বাড়ির আঙ্গিনায় লড়ে যাচ্ছে আমাদেরই দাদী, নানী, মা, চাচী, খালা, ফুফুরা। কী প্রচেষ্টা তাদের সাংসারিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। আপনারা দেখেন না, কীভাবে নিজের সন্তানকে বুকে আগলে রেখে দেশের নারীকুল লড়ছে। নগর সভ্যতায় গার্মেন্টস শ্রমিক থেকে শুরু করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। রাজনীতিতে তো নারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব অঙ্গনেই নারী এখন আর পিছিয়ে নেই। শিল্পাঙ্গনেও আমরা কম বেশি ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সব ধারায় আমাদের নারীদের একটা কমিটমেন্ট থাকে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন কিংবা সাহিত্যের পাতায়; কোথায় নেই আমাদের পদচারণা। কিন্তু মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়। যখন পত্রিকার পাতায় দেখি নারীর উপর আঘাত এসেছে পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায়। আমার খুব ইচ্ছে করে, শিকার হওয়া ওই সকল নারীদের পাশে দাঁড়াতে। আমি চাই, ওদের মানসিক সমর্থন যোগাতে। যা খুব বেশি প্রয়োজন। শিক্ষার আলোকমালা যদি দেশের প্রতিটি নারীর গলায় পরিয়ে দিতে পারতাম তাহলে এর চেয়ে বড় কিছু আর কিছু থাকতো না। আমি আশাবাদী মানুষ। আমার স্বামী, সন্তান নিয়ে খুবই সুখে আছি। অধিকতর সুখ পেতে মানবতার জয়গানকে যদি আলিঙ্গন করতে পারি; এর চেয়ে ঢের সুখ আর কিছু হবে না।  এক নজরে হেলেনা জাহাঙ্গীর:- পিতা: ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হক শরীফ, মাতা: বেগম সুফিয়া শরীফ, স্বামী: মো. জাহাঙ্গীর আলম, জন্ম: ২৯ আগস্ট, ১৯৭৪, শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্নাতকোত্তর পেশা: ব্যবসা, শখ: মানবসেবা, প্রিয় বন্ধু: নার্গিস মাহমুদ খান শম্পা, ভ্রমন করেছেন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত অন্যতম। হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সদস্য। পাশাপাশি তিনি গুলশান সোসাইটি, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, গুলশান হেলথ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি ক্লাবেরও সদস্য। নারী পছন্দের তালিকায় হেলেনা জাহাঙ্গীর মাদার তেরেসা, প্রিন্সেস ডায়ানা ও বাংলাদেশ রোটারির প্রথম নারী গভর্নর সাফিনা রহমানকে পছন্দ করেন। হেলেনা জাহাঙ্গীরের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বেশ কিছু দিক। মনে প্রাণে ইসলামিক মূল্যবোধে থাকা এই গুণী নারী বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চান। দেশকে উচ্চ আয়ের চূড়ান্ত আদলে দেখতে চান। নারীর অধিকার আন্দোলনে তিনি কাজ করে যেতে চান অনন্ত। একজন ভাল স্ত্রী, ভাল ‘মা’ হিসাবেও তিনি সমাজ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে চান। যে স্বাধীনতা ১৯৭১ সালে অর্জিত হয়েছিল সেই লাল-সবুজের বাংলাদেশকে তিনি রঙ্গিন করতে চান।

This website uses cookies.