লিজান হারবালের স্বপ্নদ্রষ্টা তানিয়া হকের সাফল্যের কথা

প্রথম সকাল ডটকম: দেশের শীর্ষ টিউব মেহেদী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লিজান হারবালের নাম সবার জানা। এ প্রতিষ্ঠানটির  স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন একজন নারী। স্বপ্ন ছিল তার চোখে। যিনি কখনই ভাবেননি তিনি একদিন এতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হবেন। তার প্রতিষ্ঠানের মেহেদী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানী করা হবে। এর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে  মেহেদী প্রিয় কোটি হৃদয়ে। যার স্বপ্নের কারণে আজ প্রতি ঈদ মৌসুমে প্রায় ৫০০ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয় এই প্রতিষ্ঠানে। এছাড়াও এসব নারী কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যায় পাশে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। লিজানের পণ্য রপ্তানি আজ শুধু বাংলাদেশের বাজারেই নয় তা বিশ্বের অন্যতম দেশ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও সুনাম কুড়িয়ে সেরা স্থান দখলের পথে। প্রতিষ্ঠানটির সত্ত্বাধিকারী ও চেয়ারম্যান তানিয়া হকের একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নেপথ্যের নানা কাহিনী। দীর্ঘদিনের পথচলা, তানিয়ার আবেগ, অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার কথা। বৃক্ষপ্রেমিকরা বুঝি এমনই হয়। তার প্রমাণ মিললো লিজান হারবালে অফিস খুঁজতে গিয়ে। পাতায় আচ্ছাদিত গোটা অফিস ভবন।সুন্দর কারুকাজ। চারিপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর সাজানো গোছানো বিল্ডিং। অফিসে বেশ পরিপাটি করে সাজানো তার সব কিছুই। প্রথমেই সাক্ষাৎকার করেই মুচকি হাসলেন তিনি। তারপর শুরু করলেন তার স্বপ্নের লিজানের কথা। গল্পটা শুরুর বছর ১৯৯৫। তখন বাংলাদেশে তেমন করে টিউব মেহেদীর নাম তেমন কারো জানা ছিলনা। কারণ  মেহেদী বা মেয়েদের সৌন্দর্য  চর্চার জন্য অন্য  কোন হারবাল পণ্য তখন  বাংলাদেশেই তেমন  একটা উৎপাদন  হয়নি। তিনি একদিন গিয়েছিলেন ঢাকার বাণিজ্য মেলায়। বাণিজ্য মেলা ঘুরে তার চোখে পড়লো সেই মেহেদী। সেই সময় এর উৎপাদন হতো শুধু থাইল্যান্ড, ইন্ডিয়ায়। এই দুটি দেশেরই বাজার তখন একচেটিয়া। সেই মেলায় বাংলাদেশের কোন হারবাল পণ্য তেমন নেই বললেই চলে। তখন তিনি ভাবলেন। এ মেহেদী ও হারবাল পণ্য তো আমরাও উৎপাদন করতে পারি। কারণ আমরা বাঙ্গালীরা কি না পারি? তানিয়া হক পড়ালেখা করেছেন ব্যবস্থাপনা ব্ষিয়ে। এ বিষয় থেকে তিনি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরও করেছেন। তারপর তিনি তখনই স্বপ্ন আঁকতে শুরু করেন কিছু একটা করবেন।কিন্তু কি করবেন তা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মেলায় ঘুরে আসার পরেই তার ইচ্ছা জাগলো তিনি বাংলাদেশের হারবাল সেক্টরে কাজ করবেন। এরপর ১৯৯৫ সালে  মাত্র ৪ লাখ টাকায় শুরু করেছিলেন লিজান হারবালের যাত্রা। এরপর আর তাকে পিছু তাকাতে হয়নি। তবে এই সেক্টরে কাজ করতে আর সাফল্যের সুতো বুনতে বেশি সহযোগিতা করছেন তার স্বামী। লিজানের যাত্রা শুরুর আগে বাংলাদেশের  হারবাল  জগতে তেমন কোন পণ্য ছিলই না। তাই তার আত্মবিশ্বাসও ছিল প্রবল। ভাল প্রোডাক্ট দিতে পারলে মার্কেট তৈরি ও তা দখলে রাখায়  কোন সমস্যা হবে না। এ প্রবল আত্মবিশ্বাসই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় সফলতার মিনারে। আত্মবিশ্বাসী তানিয়া হক সবসময়ই কাজ করতে পছন্দ করেন। তাই রাতদিনই কাজ করেছেন। এতো বড় একটা কোম্পানির মালিক হয়ে যাবেন তা তিনি কখনও ভাবেন নি। আর তার এতো বড় স্বপ্নও ছিল না শুরু দিকে। শুধু নিজের বেষ্টটা উপহার দেয়ার জন্য প্রবল ইচ্ছা ছিল। তাই করেছেন তিনি। সব সময় নিজের সাধ্যমত সেরা উপায়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। আর নিজের স্বামী পাশে থাকায় এই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই কম ছিল তার জন্য বলে জানালেন তিনি। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা তানিয়া হক একজন ব্যবসায়ী, একজন গৃহিণী, একজন স্ত্রী সেই সাথে একজন মাও বটে। হাজারও ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি নিজেকে মেলে ধরেছেন। নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন সদা। তানিয়া বলেন, “আমার স্বামীর শতভাগ ভাগ সমর্থন দিয়েছে বলেই এটা করা বেশ সহজ হয়েছে। মা হিসেবে নিজের সন্তানদের প্রতিও অত্যন্ত যত্নশীল তিনি। ব্যবসা তার মাতৃচেহারাকে কোনভাবেই বিকৃত করেনি। তবে রুটিনে ছক মেপে কাজ করতে পারলেই সব ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করা যায় বলে মনে করেন এই নারী উদ্যোক্তা। প্রত্যেক অভিভাবককে নিজের বাচ্চাদেরও এই জন্য নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর জন্য তিনি পরামর্শ দিলেন। তানিয়া হক জানালেন, তার সন্তানদের গোসল, খাওয়া, টিচারের কাছে পড়া, কুরআন পড়ার সময় সব ঠিক করে দেওয়া। তারা সেই অনুযায়ীই সব কাজ করে। তানিয়া হকের এই পথচলায় তার স্বামীর অবদান অতুলনীয়। তারা সন্তানের লালনপালন থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজই সমানভাবে দেখা শোনা করেন। তানিয়া হক আগে থেকেই নামাজ পড়তেন। আর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি তীব্র দুর্বলতার কারণেই ২০০৯ সালে পবিত্র হজ্ব পালনে যান। তারপর থেকেই তানিয়া হকের জীবনচরিত ও নানা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। সেই থেকে অনেক অতিরিক্ত আমলও করতে শুরু করেন তিনি। এখন তার ঘরের টেবিলে বঙ্গানুবাদ সহ কুরআন শরীফ দেখতে পাওয়া যায়। সেই কুরআন তিনি প্রতিদিনই পাঠ করেন বলেও জানালেন। হিজাবের কারনে পেশাগত জীবনে কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হিজাব তাকে নারী হিসেবে সম্মানিত করেছে। বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামে হিজাব পরে যাওয়ায় অনেক ভক্ত এবং দর্শকরা তার দেখাদেখি হিজাব পরেছে। তিনি বলেন, এই রকম পর্দা দেখে অনেকেই হিজাব পরার কারণ জানতে চায় এবং কেউ আবার উদ্বুদ্ধ হয়ে আমার মতো হিজাবকে গ্রহণও করেছে। তার প্রতিষ্ঠান লিজান হারবাল বাংলাদেশের একটি খ্যাতিমান হারবাল কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির এখন ২ টি ফ্যাক্টরি রয়েছে। যার একটি ধামরাই অপরটি কুষ্টিয়ায় অবস্থিত। তানিয়া হকের স্বপ্ন একদিন লিজান ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে বাংলাদেশের হারবাল প্রোডাক্টের কর্ণধার হবে। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তানিয়া হক বললেন মহিলাদের অবশ্যই কাজ করা উচিৎ। সৃষ্টিশীল কাজ। অযথা সময় অপব্যয়ের হাত থেকে মেয়েদের রক্ষা করতে হবে। তাদের মনকে প্রশস্ত করে কাজে লাগতে হবে। তবে একবারে খুব বেশী ঝুঁকি না নিয়ে পছন্দসই সেক্টরে অল্প বিনিয়োগে কাজ শুরু করার পরামর্শ দেন এই নারী উদ্যোক্তা। ছবিতে লিজান হার্বালের চেয়ারম্যান তানিয়া হক ও তার পথচলার প্রেরনাদানকারী স্বামী। সুত্র: মহীয়সী ম্যাগাজিন থেকে নেয়া।

This website uses cookies.