শেষ হলো জিহাদ উদ্ধারের রুদ্ধশ্বাস অভিযান!

সলিম আহমদ: রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে শুক্রবার বিকেল ৪টার সময় পাইপের মধ্যে পড়ে যাওয়া শিশুর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা ক্যামেরা নিচে পাঠিয়েও মানব দেহের কোন অস্তিত্ব খোজে পাননি বেসরকারী ভাবে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া ওয়্যার হাউজ নামের সংগঠনটি। তারা তাদের তৈরী অত্যাধুনিক ক্যামেরা দিয়ে শিশু জিহাদের খোজ করেন। তাদের ক্যামেরায় পাইপের নিচে পড়ে পড়ে থাকা কিছু ককসিট, কাগজ ও নারিকেলের খোসা দেখতে পান। যা সরাসরি বিভিন্ন গনমাধ্যমে দেখানোও হয়। পরে ঐ সংগঠনের পক্ষ থেকেও পাইপের ভিতর কিছু নাই বলে ঘোষনা দেয়া হয়। এরপর স্হানীয় লোকজনের অনুরোধে তারা আবারও পাইপের ভিতর ক্যামেরা পাঠান। সে সময় পাইপের ভিতর ময়লা সরানোর জন্য ব্যবস্হা নেয়া হয়। ময়লা সরিয়ে তারা নিশ্চিত হন পাইপে জিহাদের কোন অস্তিত্ব নেই এমন কি মানব আকৃতির কোন কিছুও নেই। তবে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট এখনও ঘটনাস্হলে অবস্হান করছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন প্রয়োজনে আরও অনুসন্ধান চালানো হবে। প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর ফায়ার সার্ভিস সেখানে অবস্হান করছেন। সর্বশেষ পাইপের চারিদিক খনন করে দেখা হবে জিহাদের অবস্হান কোথায়। এমনটি জানিয়েছেন সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমদ খান। এদিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিশু জিহাদের বাবাকে শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার সময় আটক করেছে পুলিশ। তাকে শাহজাহানপুর থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিয়াদের বাবা নাসির উদ্দিন মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জিয়াদ সবার ছোট। শিশু জিহাদের উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসা ও রেল বিভাগের তৎপরতায় কোনো সমাধান না মিললেও তৈরি হয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন। যেভাবে শুরু হয় জিহাদের উদ্ধার কাহিনী। শুক্রবার বিকেল ৪টা:- খেলতে গিয়ে পাইপের মধ্যে পড়ে যায় শিশু জিয়াদ। পাইপের কাছে থাকা এক শিশু জিয়াদের কান্না শুনতে পায়। এরপর এক তরুণীও জিয়াদের কান্না শুনতে পান। ছড়িয়ে পড়ে শিশু জিয়াদ পাইপের মধ্যে পড়ে গেছে। বিকেল ৫টা:- বিকেল চারটার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়লেও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয় পাঁচটার পর। শুরুতে স্থানীয়রা দড়ি নামিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। তাদের মতে, শিশুটি বেশ কয়েকবার দড়ি ধরে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু তখন পর্যন্ত আসলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি শিশুটি সত্যিই বেঁচে আছে কিনা। জিহাদ বেঁচে আছে:- সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের একজন জানান, শিশুটি পাইপের ভেতর থেকে সাড়া দিচ্ছে। সে বেঁচে আছে। তাদের ডাকে শিশুটি সাড়া দিয়েছে এবং কেঁদেছে বলে জানান তিনি। এতেই গণমাধ্যম যেমন বেশি সজাগ হয়ে ওঠে তেমনি তৎপর হয় উদ্ধারকারী দলও। জিহাদের জন্য জুস, খাবার, অক্সিজেন ও পানি:- যেহেতু শিশুটি বেঁচে আছে, তাই তাকে সুস্থ রাখতে দড়ির মাধ্যমে জুস, খাবার ও পানি পাঠানো হয়। এছাড়া পাইপ দিয়ে সরবরাহ করা হয় অক্সিজেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দাবি করেন, শিশুটি খাবার ও জুস খেয়েছে বলে জানিয়েছে। সে তার বাবার সঙ্গে কথাও বলেছে। ফায়ার সার্ভিসের দড়ি প্রযুক্তি :- দড়ি নামিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা ছাড়া ফায়ার সার্ভিস আর কিছু করতে পারেনি। পাইপটি কত ফুট গভীর তাও তারা ঠিক করে বলতে পারেননি। কখনও বলেছেন ৩০০ ফুট কখনও ৬০০। রেলের প্রকৌশলী বরখাস্ত ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কালো তালিকা:- উদ্ধার অভিযান চলার সময়ই রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস আর হাউসকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। ৩০০ ফুট পাইপ টেনে তোলা:- ১৭ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মধ্যে সাবমার্সিবল পাম্পের একটি চিকন পাইপ লাগানো ছিল, ওই পাইপটি কেটে কেটে টেনে তোলা হয় রাত দশটার পর। এরপর ওই পাইপ বেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী নেমে শিশুটিকে উদ্ধার করবেন। প্রস্তুত সেই বশির আহমেদ:- রাত সাড়ে ১১টা। পাইপের মধ্যে নেমে শিশু উদ্ধারে প্রস্তুত রানা প্লাজায় উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া সেই বশির আহমেদ। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে পাইপের মধ্যে নামতে দিতে নারাজ ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। কারণ যদি পাইপের গভীরতা সত্যিই ৬০০ ফুট হয়, সেক্ষেত্রে বশিরকে তেমন কোনো সহায়তাই করতে পারবে না ফায়ার সার্ভিস। অবশেষে বশিরকে পাইপের মধ্যে নামতে দেয়া হলো না। ক্যাচার পদ্ধতি:- বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্যাচার নামের এক যন্ত্র তৈরি করে এর মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার কথা বললেন। তবে সিদ্ধান্ত হয়, ক্যামেরা দিয়ে আগে শিশুটির অবস্থান সনাক্ত করা হোক। এলো ওয়াসার ক্যামেরা:- অবশেষে পাইপের ভেতরে দেখার জন্য ওয়াসার ক্যামেরা এলো। কিন্তু ক্যামেরাটি নতুন। এ ধরনের কোনো কাজে তা ব্যবহার করা হয়নি। দীর্ঘক্ষণ লাগলো তা চালু হতে। চালু হওয়ার পর মাঝপথে তা আবার বন্ধ হয়ে গেলো। আবার চালু হলো। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো পাইপের শেষ মাথায় কোনো শিশুর শরীর নেই। কিছু কাগজ আর পোকামাকড় ছাড়া ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়লো না। পুরোটাই গুজব:- ক্যামেরায় দেখার পর পাইপের মধ্যে শিশু পড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ গুজব বলে দাবি করলেন উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া এনএসআইয়ের যুগ্ম-মহাপরিচালক আবু সাঈদ রায়হান। ভেতরে কেউ নেই: স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী:- ক্যামেরায় ছবি দেখে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা নিচে নামানো হয়েছিল, সেখানে মানুষের কোনো অস্তিত্ব দেখা যায়নি। কিছু কীটপতঙ্গের ছবি দেখা গেছে। ক্যামরায় দেখে মনে হচ্ছে সেখানে কেউ নেই। তারপরও পাইপের নিচে যে আবর্জনা আছে সেগুলো তুলে আমরা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখবো। আসল ক্যাচার:- ওয়াসার অনুসন্ধানের পর নিয়ে আসা হলো দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরী ক্যাচর। কিন্তু সেটাও কোন কাজে আসল না। কারন সেটার সাইজ পাইপের সাইজ থেকে বড় ছিল। ফের আশা জাগানিয়া ক্যামেরা:- ঢাকা ওয়াসার পর রাত ৩টার দিকে ঘটনাস্হলে আসে তৃতীয় পক্ষের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের একটি দলও ক্যামেরা নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে এবং তারাও পাইপের মধ্যে ক্যামেরা নামিয়ে দিয়ে খুজতে থাকেন জিহাদকে। অবশেষে কিছুই নেই:- অবশেষে তারাও বলেন পাইপের নিচে ময়লা আবর্জনা ছাড়া কিছুই নেই। তাদের বক্তব্য, নিচে কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই। এমনকি কোনো পানিও নেই। পরে স্হানীয় লোকজনের অনুরোধে তারা আবারও ক্যামেরা নিচে নামিয়ে জিহাদকে খোজতে থাকেন। কিন্তু কোন কিছুই খোজে পাওয়া যায়নি। এদিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করলেও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তার সদুত্তার পাওয়া যায়নি। ভোর ৬টা পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস জিহাদ উদ্ধার অভিযানে চলে। সন্ধ্যা থেকেই দেশের কয়েকটি টিভি স্টেশন ঘটনাটি লাইভ সম্প্রচার করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ছাপিয়ে বড় ঘটনা হয়ে ওঠে জিয়াদ। সারা দেশের মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে আবেগ আর উৎকণ্ঠা।

This website uses cookies.