ছিন্ন বস্ত্র ও সালেহার গল্প

বেলাল রিজভী: ও ভাইজান, ভাইজানরে আমার দুইডা পাও নাই। আমি কাম করতে পারি না। ও ভাইজান, ভাইজানরে আমারে দুইডা ট্যাহা ভিক্যা দ্যান। আপনেগো দয়া ছাড়া আমার বাঁচোনের কোনো উপায় নাই’ এমনই উচ্চ স্বরে বিলাপ করে ভিক্ষা করে সলেমান। গায়ে মাটি, পরনে কালি মাখা প্যান্ট রশি দিয়ে বাঁধা। একটি পা-ও দেখা যায় না। বয়স আনুমানিক সাতাইশের কাছাকাছি, প্রতি দিন সকাল হতে না হতেই কাঠপট্টি ব্রিজের উপরে গিয়ে বসে ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে। কখনও মুক্তিসেনা স্কুলের বারান্দায় ঘুমায় আবার কখনও রাস্তি মাদ্রাসার বারান্দায়, এভাবেই দিন কাটে সলেমানের। প্রতি দিনের ভিক্ষার টাকা একটা পুটলিতে বেঁধে রাখে সলেমান। যে সময় লোকজন ব্রিজের ওপর দিয়ে কম হাঁটে সে সময় ভিক্ষাও কম পায়। কাঠপট্টি ব্রিজে সালেহাও ভিক্ষা করে। ওর চোখ নেই, অন্ধ। বয়স বাইশ অথবা তেইশ, ফর্সা শরীর এখন রোদে পোড়া তামাটে রং ধারণ করেছে। লাউয়ের ডগার মতো অযত্ন অবহেলায় বেড়ে ওঠা শরীর ময়লা-কালি কুচকানো। মাঝে মাঝে ওড়নাটা বুক থেকে সরে যায় কিন্তু নজর দেয় না সে। একটা কুকুর প্রায়ই শোয়া থাকে। মাঝে মাঝে সলেমানের শরীর চেটে দেয়। সলেমানের ভালোই লাগে, এই কুকুর ছাড়া একা কখনওই সলেমান খায় না। কুকুর যখন খাবার খায় আর লেজ নাড়ে তা দেখে সলেমানের আনন্দই লাগে। আর হাঁক দেয় সালেহাকে। ‘দ্যাখ, সালেহা দ্যাখ, কুত্তাডা কি সোন্দর, কি আনন্দ কইরা খাইতাছে দ্যাখ? সালেহা উত্তেজিত কণ্ঠে জবাব দেয়, ‘তুমি তোমার কুত্তা লইয়া থাকো, আমি কী চোহে দ্যাহি? তুমি আমারে দ্যাখ দ্যাখ করো। আমি কইয়া দিলাম তুমি কোনো সোমায় আমারে খ্যাপাইবা না, তুমি পারলে কুত্তাডারে এ্যাটটা লাথি দেও তো। ‘আমি কি লাথি দিবার পারি? তুই জানস না আমার পাও নাই। তুই এ্যাহন আমারে খ্যাপাস ক্যা? ‘তুমি আমারে খ্যাপাইলা ক্যা তয়লে? ‘আরে তোরে খ্যাপাইয়া আমি শান্তি পাই, হেই জিন্যে খ্যাপাই। এভাবেই ওদের দিন কাটে। দুপুর বেলা লোকজন কম চলাচল করে, আর তখনই শুরু হয় ওদের আলাপ। ‘কি রে সালেহা তুই কত কামাইলি? আরে কইও না, আইজকা কামাই নাই। ‘এ্যাহন আমার দিলের দুইডা খাস কথা হুনবি? ‘কী কইবা, কয়া ফ্যালাও। হারা দিনই তো কও। নতুন কী কথা রইল কও? ‘তোর কী ঘর করনের মোনে লয় না? ‘সলেমান ভাই বিশ্বাস কর এ্যাই কথাডা কেউ আমারে জিগায় নাই। তয় ঘর করতে মোন চায়। কিন্তুক কেডায় আমার লগে ঘর করবো? ‘আমি যদি করবার চাই। ‘কী যে কওনা সলেমান ভাই। এ্যাত খোয়াব দ্যাহাইও না। আমগো আবার ঘার সংসার’- একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সালেহা জবাব দেয়। ‘ক্যা আমাগো কি স্বাদ আহ্লাদ নাই? তুই আমারে নিরাশ করিস না। দেহিস আমাগো ঘর সংসার হইবোই? এভাবেই দিনে দিনে সখ্য বাড়ে। এখন দুজনে একই স্কুলের বারান্দায় রাত কাটায়। এক সময় সালেহার কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে সন্তান। সমাজের বিত্তবানরা রাস্তার শেষ মাথায় একটা ঘর তুলে দেয়। একটু মাথা গোজার ঠাঁই হয় সলেমান আর সালেহার। ওরা সমাজকে দেখিয়ে দেয়, আমাদের পা না থাকলে কী হবে, আমাদের চোখ না থাকলে কী হবে, আমরাও পারি সংসার করতে। সন্তান জন্ম দিতে। আমরাও পারি বাবা ডাক কিংবা মা ডাক শুনতে। এভাবে সালেহা-সলেমান দিন ভালোই চলছিল। দুজনের ভিক্ষার পায়সায় ওদের সংসার চলে যায়। সারা দিন ভিক্ষা শেষে রাতে শুয়ে শুয়ে দুজনে কত পরিকল্পনা করে? কত স্বপ্ন দ্যাখে? ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবে, মানুষের মতো মানুষ করবে; তারপর ছেলে অনেক বড় হবে, ওরা ভিক্ষা ছেড়ে দেবে। কষ্টগুলো তাড়িয়ে দেবে। দুজনের বড় আদরের সন্তান। একটু কেঁদে উঠলেই সলেমান ডাক দেয়- ‘কী ওইল হাসুর মা তোমার ছাওয়াল কান্দে। ওরে কান্দাইও না। ওই-ই তো আমাগো সুখ দিবো। আমাগো রাজা-রানী বানাইয়া রাখবো। সালেহার জবাব দেয়, ‘ছাওয়াল কী আমার একলার, তোমার না?’ বলতে বলতে সালেহা এসে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়, ‘ও-ও- বাবা কান্দে না। তুমি বড় হইবা, ট্যাহা কামাই করবা, রাঙা-রাঙা শাড়ি আনবা’- এভাবেই সালেহা ছেলের কান্না থামায়। ছেলের বুকে মুখে চুমো খায়, মা বাবার আদরে হাসুর দিন ভালোই কাটে। কিন্তু এই সুখ বেশি দিন কপালে সয় না ওদের। একদিন সলেমান ভিক্ষা করতে গিয়ে ব্রিজ থেকে আড়িয়াল খাঁ নদীতে পড়ে যায়। তারপর কতো খোঁজাখুজি, স্রোতের তোড়ে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। লাশটিরও হদিস মিলেনি। সালেহার স্বামীহারা বিলাপে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সে কী কান্না! অভাবের সংসারে ভিক্ষাই সালেহার একমাত্র কাজ। দু’জনের ভিক্ষার টাকায় সংসার চলতো। এখন শুধু সালেহার একার পক্ষে খুব কষ্ট হয়। তাও আবার সলেমানের কথা চিন্তা করে মাঝে মাঝে রোগে-শোকে বিছানা নেয় সে। ঠিক মতো কাজে যেতে পারে না। হাসুর বয়স এখন প্রায় তিন বছর। হাসু কাজ শিখে ফেলেছে, মাঝে মাঝে যখন সালেহা অসুখে পড়ে তখন হাসুই সংসার চালায়। সালেহার ঘরটা গ্রামের শেষ প্রান্তে রাস্তার থামায়। একটু দূরেই সোয়াবালী মাদবরের বাড়ি। রাস্তার পারে যে ঘরটিতে সালেহা থাকে সেই জায়গাও মাদবরের। মাদবরের বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। লাঠিয়াল বংশ, বংশে অনেক লোক আছে। গ্রামের সকলেই সমীহ করে। যেমন বীজ তেমন ফসল। মাদবরের ছেলেও হয়েছে মাদবরের মতোই- সেলিম। মাদবর ডাকে ‘সেলিম্যা’ বলে। মাদবর ছেলের খুব প্রশংসা করে। আমি মইরা গ্যালে আমার নাম রাখতে সেলিম্যাই পারবো। সেলিমের উঠতি বয়স। ভালো মন্দ সব কাজই সে পারে। সমাজে সুনামের চেয়ে দুর্নামই বেশি। কাজের চেয়ে অকাজেই বেশি পটু। একদিন সেলিম আসে সালেহার ঘরে। সালেহা আর্তনাদ করে ওঠে, ‘সেলিম ভাই চইল্যা যান। ‘কেন যামু? ‘কওন যাইবো না। ‘তারাতারি ক! ‘যদি কই তয়লে কী আপনে চইল্যা যাইবেন? ‘না, আমার মাথা গরম। তুই তাড়াতাড়ি …। ‘না সেলিম ভাই, এ্যামুন কাম কইরেন না। কাইলকা আপনার বাপে আইছিলে। ‘চুপ। চুপ কর হারামজাদী। একটু শব্দ করবি না। যদি কারো কাছে এই কথা কস তয়লে তোরে আর তোর পোলারে কাইটা গাঙ্গে ভাসাইয়া দিমু। তুই জানস না আমি আমার মায়রে ছাড়া কাওরে ডরাই না। মায় মাইরা গ্যাছে হেই জন্যে আমার ডরও মইরা গ্যাছে। তারপর সেলিম নিশ্চিন্তে নির্দ্বিধায় কাজ শেষ করে। সালেহা যেন সেলিমের রক্ষিত ধন। যে কোন সময় ভোগ করতে পারে। যখন ইচ্ছা তখন। সালেহার নিজের কাছে নিজের বড় বিরক্ত লাগে, কান্না আসে। অঝোর ধারায় কাঁদে। নিজেকে ধিক্কার দেয়, ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করতে। কিন্তু হাসুর চিন্তা করে সব সয়ে নেয়। সালেহার বেশি ঘেন্না ধরে বাপ ছেলে দুইজনের কথা চিন্তা করে। নদীর স্রোতের মতো দিন গড়াতে থাকে। দিনে দিনে সালেহা দুর্বল হয়ে পড়ে। স্ফীত পেট সকলেরই নজরে পরে। বন্যপ্রাণির গর্ভধারণ নিয়ে যেমন চিন্তাভাবনা নেই, সালেহারও তেমন। কে ওকে গর্ভবতী করল, কীভাবে গর্ভবতী হলো এসব নিয়ে ওর চিন্তা নেই। চিন্তা করার সময়ও নেই। ভিক্ষা দুই পয়সা বেশি পেলেই হলো। কিন্তু ভিক্ষাও এখন মানুষ কম দেয়। এ-কথা ও-কথা বলাবলি করে। ইস্ ভাতার মইরা গ্যাছে কত বছর আগে এ্যাহন আবার পেড হইছে। মা হওনের কত শখ! এখন সমাজের সবার আলোচনা সালেহা। সমাজের গণ্যমান্য সবাই একদিন সিদ্ধান্ত নেয়, সালেহাকে কে গর্ভবতী করল বের করতেই হবে। সে মোতাবেক ঘোষণা দেয়া হয়, আগামী সোমবার সবার সামনে স্কুলের মাঠে ডেকে এনে ওকে জিজ্ঞাসা করা হবে কে ওকে গর্ভবতী করল। রবিবার রাতে কালো কাপড়ে মুখ বাঁধা একদল লোক এসে সালেহাকে ডেকে ওঠায়। আট বছরের হাসু সব দ্যাখে। কিন্তু সব কিছু না শোনার, না দেখার ভান করে চোখ বুজে থাকে। ঘর থেকে নিয়ে যায় সালেহাকে। কিছুক্ষণ পর হাসু ধীর পায়ে ওদের পিছু যেতে থাকে। ওর মাকে এক দল লোক লতাপাতা ঘেরা জঙ্গলের ভেতর নিয়ে যায়। হাতে ধারালো চকচকে হাসুয়া। এক সময় সালেহার কাপড় টেনে খুলে ফেলে দুর্বৃত্তরা। তারা মুখে বাঁধা কালো কাপরও খোলে। হাসু আড়াল থেকে দেখে এক জনকে চিনতে পারে। বাকিগুলোকে সে কখনও দেখেনি। হাসু দেখে ধারালো হাসুয়া দিয়ে মায়ের শরীর ছিন্নভিন্ন করছে তারা। হাসু ভয়ে আঁতকে ওঠে। চোখের সামনে সে তার মাকে এভাবেই খুন হতে দেখে। হাসু চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে যায়। সালেহার ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ পড়ে থাকে। ওরা হাসতে হাসতে চলে যায়। হাসু এবার মায়ের দিকে এগিয়ে আসে। মায়ের রক্তাক্ত দেহ দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতেই হাসু ঘরে ফেরে। তখন প্রায় মধ্য রাত। সকালে শত শত লোক স্কুলের মাঠে। সকলেরই নীরব কানাঘুষা, কে সালেহাকে গর্ভবতী করল? স্বামী তো মারা গেছে কয়েক বছর আগেই। ওরা কী মানুষ না পশু? সমাজপতিরা সালেহাকে ডাকতে লোক পাঠিয়েছে, আজ সালেহা সবার সামনে বলবে কে ওকে গর্ভবতী করল। ওকে বলতেই হবে। তারপর বিচার হবে সেই পশুটার। কিন্তু সালেহাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে সে নেই। আশপাশের কোনো বাড়িতেও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে, মাদবর বাড়ির পিছনের জঙ্গলে সালেহার লাশ পড়ে আছে। খবর শুনেই পুরো গ্রাম দৌড়ায় সেদিকে। হ্যাঁ, লাশটা সালেহারই বটে। চারদিকে সিঁদুর রঙ্গা রক্ত। বিবস্ত্র লাশের উপর মাছি ভনভন করছে। কয়েকটা পিঁপড়া হাঁটছে গায়ের উপর। গালে কামরের চিহ্ন, শরীরে নখের আচর। খবর পেয়ে পুলিশ ময়না তদন্তের জন্যে নিয়ে যায় লাশ। মার্ডারের পর থেকে মাদবরকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেলিম থানায় মামলা করে। বাবার জন্য সেলিমের সে কি কান্না! সালেহার মৃত্যু রহস্য উদঘাটিত হয় না, চাপা পড়ে যায় মাদবরের মামলায়। অপহরণ আর মার্ডারের রহস্য আজীবন গ্রামবাসীর কাছে রহস্যই রয়ে যায়। এ রহস্য এখনও গল্পের মতো সবার মুখে মুখে ফেরে। হয়তো লোককথার গল্প হবে। কিন্তু সেই গল্পও একদিন শেষ হয় যখন একদিন অলৌকিকভাবে মাদবর গ্রামে হাজির হয়। সকলেই বলাবলি করে আল্লায় ওনারে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। তাপর জীবন রক্ষার জন্য মাদবর মসজিদে মসজিদে মিলাদ দেয়। দোয়া দরুদ পড়ায় হুজুর ডেকে। ওদিকে হাসু এখন যুবক। প্লাটফর্ম, বস্তি এখানে সেখানেই কেটেছে ওর জীবনের সবটুকু সময়। ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে এখন কুলির কাজ শুরু করেছে হাসু। শৈশবের স্মৃতি আজও ওকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মধ্যরাতে এখনও ঘুম থেকে সে আঁতকে ওঠে সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করে। তারপর ‘মা-মা’ করে অনেকক্ষণ কাঁদে। নিজের চোখের সামনে দেখেছে মাকে হাসুয়া দিয়ে ছিন্ন ভিন্ন করতে। সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে বেড়ে উঠেছে হাসু। আর কখনও সে গাঁয়ে ফিরে যায়নি। কুলিগিরি করে হাসু যা আয় করে তাতে একটা পেট ভালোই চলে যায়। তবুও মনে শান্তি নেই, কি যেন কষ্ট! আজ হাসুর শান্তি লাগছে। অনেক দিনের টাকা জমিয়ে আজ সে একটা ছুরি কিনেছে। এবার তাকে গাঁয়ে ফিরতে হবে। হাসু মুঠোর মধ্যে ছুরিটা শক্ত করে ধরে। দুচোখে সে এখনও স্পষ্ট দেখতে পায় কাপড় বাধা সেই মুখের ছবি।

This website uses cookies.