বিজয়ের ৪৩ বছরের আর্তনাদ : সোনার বাংলা আাজ শ্মসান কেন?

0জাহিদ হাসান: সোনার বাংলা শব্দ দুইটা শুনলে বা মনে মনে অনুভব করলে সারা দেহ ও মন এক অফুরন্ত আবেগ ও স্বপ্নে ভরে উঠে। এই আবেগ ও অনুভূতির নির্ভয় ও বলিষ্ঠ প্রেরনা বাংলাদেশের মানুষকে ১৯৪৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রবল ও নির্ভেজাল দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করতে থাকে এবং বাংলার জনগন আগ্রাসী ও দখলদার হায়েনা ও বর্গিদের কাছ থেকে সোনার বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য ১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। সোনার বাংলা শব্দ দুইটা অনুভব করলে বাংলার মানুষের মনে ও স্বপ্নে ভেসে উঠে মাঠ/গোলা ভরা ধান, কৃষকের মুখে সুখ ও প্রশান্তির হাসি, পুকুর ও নদীভরা মাছ, সবুজ-শ্যামল বাংলার বিশ্বনন্দিত প্রাকৃতিক ও নৈষর্গিক রূপ, বাউল/ভাটিয়ালী/পল্লি ও লালন গীতি/ভাওয়াইয়া/মুর্শিদী গানের দেহ-মহ জাগানো মাটির গানের সংস্কৃতি, হাহাকার/ক্ষুধামুক্ত উন্নত ও নিশ্চিত জীবন ও জীবিকা, হানাহানি/খুন-খারাবী মুক্ত মানুষের মৌলিক ও গনতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তাপূর্ন এবং পারষ্পরিক সৌহার্দের ও সম্প্রীতির একটা শান্তির আবাসভূমি। এই স্বপ্ন ও চেতনাকে বুকে ধারন করেই বাংলার লাখ লাখ সন্তান জীবন উৎসর্গ করে এবং লাখ লাখ মা-বোন তাদের ইজ্জত ও সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে এই স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল।। প্রতিবছরের মত এবারও ডিসেম্বর মাস চলছে, টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে বিজয়ের বীরত্বগাথা কাহিনীর উত্তাল অনুষ্ঠানমালা ও লেখালেখি প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিনত করতে বা গড়ে তুলতে ১৯৪৭ সালে পকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে যাকে বা যেটাকে প্রধান বাঁধা মনে করা হত বা সত্যিই প্রধান বাঁধা ছিল তা হলো পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক ও শোসক গোষ্টি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে বাংলার জনগন সে বাধা দূর করতে সক্ষম হয়েছে। দেখতে দেখতে বিজয়ের তথা স্বধীনতার ৪৩ বছরও পার হয়ে গেল। ৪৩ বছর একটা স্বাধীন দেশ তথা জনগনের জন্য মোটেও কম সময় নয়, দীর্ঘ ৪ যুগের কাছাকাছি। এ দীর্ঘ সময়ের পথযাত্রায় আমাদের স্বাধীন দেশ ও আমরা বাংগালীরা এখন যেখানে এসে পৌছেছি এখান থেকে (বর্তমান অবস্থা) দাড়িয়ে আমাদেরকে অবশ্যই পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে হবে আমরা কোথায় ছিলাম এবং কোথায় আছি অর্থাৎ অতীতে আমাদের অবস্থা কেমন ছিল এবং এখন আমরা কেমন আছি। বর্তমানকে অতীতের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন না করলে সঠিক অবস্থান যেমন বুঝা যায়না তেমনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিক-নির্দেশনাও সঠিকভাবে নির্ধারন বা প্রনয়ন করা সম্ভব নয়। অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর বা অতীতের সাথে বর্তমানকে তুলনা করার অর্থ কোনভাবেই অতীতে ফিরে যাওয়াকে বুঝায়না। স্বাধীনতা পরবর্তি অবস্থার মূল্যায়ন করতে হলে স্বাধীনতা পূর্ববর্তি অবস্থার সাথেই তুলনা বা বিচার করতে হয়। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা পূর্ববর্তি অবস্থার সাথে বাংলাদেশের তথা বাংলার জনগনের বর্তমান অবস্থার তুলনা করতে গেলেই তথাকথিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বা দাবীদাররা একে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়া, পাকিস্তানের দালাল বা রাজাকার বা স্বাধীনতা বিরোধী, ইত্যাদি বলে গালমন্দ ও অখ্যায়িত করতে থাকে। অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের দেশের শাসক গোষ্টি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের গালভরা বুলি ও প্রতিশ্র“তির কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বা এ ব্যাপারে তাদের সফলতা ও ব্যর্থতা কতটুকু অতীতের সাথে তুলনা করে তা মূল্যায়ন করতে গেলেই তাদের শরীরে জ্বালা ধরে যায়। অথচ দেখা যাচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকে তাদের কোন ব্যর্থতা বা কোন কাজের সমালোচনা করলে খুব সহজে ও স্বাভাবিকভাবেই অতীত সরকারের সাথে তুলনা করে নিজেদের ব্যর্থতা বা দায়ভার অতীত শাসকদের উপর চাপিয়ে দেয়। এ মানষিকতা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারছিনা বলেই আমাদের ভুল-ত্রুটি ও ব্যর্থতার ব্যাপারে আমরা অন্ধ হয়ে আছি, ফলে আত্ম-সমালোচনা ও অনুশোচনা করা থেকে বঞ্চিত হয়ে সংশোধিত, পরিশোধিত ও পরিবতির্ত হয়ে নিজেদেরকে তথা জনগনকে সোনার বাংলার স্বপ্নানুযায়ী সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছি। ১৯৭১ সালের আগে থেকে শুরু হওয়া জনগনের নাম ভাঙ্গিয়ে রাজনীতি করার একই কৌশল এখনও বিদ্যমান, এখনও রাজনৈতিক বক্তৃতা ও গলাবাজি চলছে জনগনের নাম ভাঙ্গিয়েই। কিন্তু দীর্ঘ ৪৩ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকরা জনগনকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্র“তির ও ওয়াদার কতটুকু দিয়েছে বা দিতে পেরেছে তা তারা হিসাব করবেনা বা কাউকে হিসাব করতেও দিবেনা। স্বাধীনতা বা স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে জনগনের কি প্রত্যাশা ছিল এবং দীর্ঘ ৪৩ বছরে কি অর্জিত হয়েছে বা জনগন কি পেয়েছে তার হিসাব বা মূল্যায়ন করা প্রতিটি বাংগালীর সাংবিধানিক, নৈতিক, রাজনৈতিক ও মৌলিক দাবী ও অধিকার। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংগালীদের অধিকার বা স্বাধীকার আদায়ের জন্য বাংগালীদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য বাংগালী (এপার বাংলার) জনগনকে সংগঠিত করে ও সাথে নিয়ে যারা রাজনীতি করেছেন এটা কি সত্যিই জনগনর মুক্তি, উন্নতি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য রাজনীতি ছিল নাকি জনগনের নাম ভাঙ্গিয়ে স্বার্থান্বেসী রাজনীতিবিদদের রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই ছিলনা? ৪৩ বছর পর তার হিসাব বা মূল্যায়ন করা আজ জনগনের কাছে এটা সময়ের দাবীতেই পরিনত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ ও কথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পরিচয় দানকারী দূর্বুদ্ধিজীবিরা যে শব্দটা বেশী বেশী উচ্চারন করে তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও এর বাস্তবায়ন। এটাও রাজনীতিবিদ ও এক শ্রেনীর লোকের বুলি বা কথন ছাড়া আর কিছু নয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংগালীরা যখন সশস্ত্র প্রতিরোধ তথা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল একটাই- পাকিস্তানীদের খতম কর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের লেখা বা প্রনীত (যদিও ছিলনা) মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনার কোন পুস্তলিকা (মাও শে তুং এর লাল বই এর মত) বা ইশতেহারের কোন কপি বা দলিল তখন যুদ্ধ বা সংগ্রামরত সাধারন বাংগালীদের বুকে বা গলায় লুকানো বা লাগানো ছিলনা। তাদের মূখেও তখন “বাংলাদেশ স্বাধীন কর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কায়েম কর”- এমন কোন শ্লোগানও ছিলনা। এই চেতনা কি জিনিষ বা এই চেতনা বলতে কি বুঝায় যুদ্ধের সময় বা রনাঙ্গনে সাধারন জনগনের কাছে তখন তার কোন অস্তিত্ব বা প্রভাব ছিলনা। সাধারন জনগনকে বুঝানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংগালীদের ঠকাচ্ছে, শোষন করে সব নিয়ে যাচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানে জিনিষপত্রের দাম সস্তা, পূর্ব পাকিস্তানে বেশী এসব সাদামাটা ও সাধারন জনগনকে সহজে আবেগপ্রবন করার মত রাজনৈতিক বক্তব্য ও শ্লোগান দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দটা স্বাধীনতার পর বিশেষ করে এখন এক শ্রেনীর কথিত পন্ডিত ও স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদদের মূখ থেকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। তারা নিজেরাই হয়ত এই চেতনার অর্থ বুঝেননা ও এই চেতনার বিরুদ্ধে রাজনীতি করছেন অথবা স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও এই চেতনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ জন্য সাধারন জনগন দায়ী নয়, স্বাধীনতার পর থেকে ৪৩ বছর পর্যন্ত যারা এ দেশের শাসক ও যারা শাসকদের উপদেষ্টা বা দালাল ছিল তারাই এ জন্য দায়ী। আজকের শাসক শ্রেনী যারা তাদের ভাষায় সামরিক ডিক্টেটর (জিয়া ও এরশাদ) বা শাসকদেরকে বাংলাদেশের গনতন্ত্র বিকাশ তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়নের মূল বাধা বা অপশক্তি বলে আখ্যায়িত করেন ১৯৯০ এর পর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তারা কি জনগনকে বা এ দেশকে গনতন্ত্র উপহার দিতে পেরেছেন? ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে রাজপথে মানুষ তাদের গনতন্ত্রের রূপ ভালভাবে প্রত্যক্ষ করেছে, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারীর নির্বাচনকে ঘিরে বেসামরিক পোষাক পড়া গনতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের অগনতান্ত্রিক, মারমূখী ও সহিংস আন্দোলনের যে ভয়ংকর ও আতংক সৃষ্টিকারী অগ্নিমূর্তি জেগে উঠেছিল তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছদ্মাবরনে সামরিক পোষাক পড়া সেই ডিক্টেটর বা শাসকদেরকেই গনতন্ত্র উদ্ধারের বা রক্ষা করার জন্য আবার এগিয়ে আসতে হয়েছিল। বাংগালী জাতি ভালভাবে প্রত্যক্ষ করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথিত ধারক ও বাহকদের নমুনা, স্ববিরোধি রূপ ও আদর্শিক বৈপরিত্ব। তাদের ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা যদি হয়ে থাকে বাংলা ভাষা ও বাংগালী সংস্কৃতির লালন ও উন্নতি সাধন তাহলে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের শাসনামলে বাংলা ভাষা ও বাংগালী সংস্কৃতির এ বিকৃত রূপ কেন দেখতে পাচ্ছি? স্বাধীনতার পর পর বাংলার প্রেমে উদ্ভূদ্ধ হয়ে স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকে ইংরেজীকে বলতে গেলে বিতারিত করে দেওয়া হয়েছিল, দোকান-পাঠ অফিস-আদালতের ইংরেজী সাইন-বোর্ড ও নামফলক সব পিটিয়ে ভেঙ্গে ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংশ করা হয়েছিল, স্বাধীনতার ৩০ বছর পর যখন উপলব্ধি করতে পারল এতে বাংলা ভাষাও সমৃদ্ধ হয়নি বা বাংলা সংস্কৃতিও উন্নত হয়নি, বরং যখন বুঝতে পারল বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে টিকে থাকতে হলে ইংরেজী ভাষা আয়ত্ব করা ছাড়া কোন বিকল্প নাই। তখন দেশে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যাঙের ছাতার মত শত শত ইংরেজী মিডিয়াম বা ইংরেজী ভাষার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠা শুরু হয়েছে, অর্থাৎ এক চরম থেকে আর এক চরমে যাওয়াই আমাদের বৈশিষ্ট্য, যে কোন কাজের পরিনাম বা পরিনতি কি হবে তা ভেবে অর্থাৎ বিচক্ষনতা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে কোন কাজ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে আমরা অভ্যস্থ নই, একই ধারা বা মানষিকতা এখনও বহমান। এখন ইংরেজী ভাষার ও ভারতীয় হিন্দি সিনেমা ও টিভি সিরিয়ালের ঠেলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার পথে, আজকের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা বাংলা শব্দকেও ইংরেজীর মত উচ্চারন করে আত্মতৃপ্তি পায় বা গর্ববোধ করে। ইংরেজী বর্ষের শেষ দিন “থার্টি ফাস্ট নাইট” পালন করতে এখন বাংলা মায়ের ফার্সি ছেলে-মেয়েরা উন্মাদ হয়ে যায়, বাংগালী সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে এখন বাংগালীরা ইংরেজী সংস্কৃতিকে ধারন করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। শাড়ি, সেলোয়ার-কামিজ/ওড়না পরিহার করে টাইট-ফিট জিনস্ এর পেন্ট ও বুক ফুলিয়ে ছেলেদের মত গেঞ্জি/পাজ্ঞাবী গায়ে দিয়ে এখন মেয়েরা বাংলার শাশ্বত রূপকে “দারুনভাবে ফুটিয়ে” তুলছে। বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম সম্পদ লালন, ভাটিয়ালী, পল্লিগীতি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া গানকে বিকৃত করে ব্যান্ড মিউজিক, রক মিউজিক, ওপেন-স্কাই কনসার্ট, বাংলা গদ্য পাঠের মত আধুনিক বাংলা গান (ওয়ান-টাইম বল পেনের মত) আমদানী করে বাংলা সংস্কৃতির ১২ টা বাজিয়ে দিচ্ছে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে অশালীন ভারতীয় ও পাশ্চাত্য নেংটা সংস্কৃতিকে আয়ত্ব করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে “সমৃদ্ধ” করা হচ্ছে। আর এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও উস্কানী দিচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে উঠা বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলো। ডিসেম্বর, ফেব্র“য়ারী ও মার্চ মাস এলেই টিভি চ্যানেলগুলো স্বাধীনতা, বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে অস্বাভাবিক মাতামাতি ও বাড়াবাড়ি করে রীতিমত বিরক্তির উদ্রেক করে, কিন্তু এরপর বাকী সারা বছর এরা বাংলা ভাষা, বাংগালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার যত রকম আয়োজন ও কার্যক্রম আছে তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথিত প্রবক্তা, ধারক ও বাহকরা চোখ-কান খোলা রেখেই আজ এই অপসংস্কৃতি প্রত্যক্ষ ও উপভোগ করছে এবং এদের পৃষ্ঠপোষকতাও করছে। বাংলার আজকের এই বেহাল অবস্থা দেখেই কন্ঠশিল্পি হায়দার হোসেন গেয়েছিলেন” কি দেখার কি দেখছি, কি শোনার কি শুনছি, ৩০ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুজছি”- যে গানের কথা ও সুর আজ বাস্তবতার আলোকেই হয়ত এত জনপ্রিয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৪৩ বছর পর্যন্ত যারা দেশ শাসন করছে তারা তাদের ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য এবং ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌছে দেওয়ার পরিবর্তে এক শ্রেনীর সুবধাবাদী, দূর্নীতিবাজ ও মোনাফাখোর যারা কেবল স্বাধীনতার সুফলকে তাদের নিজেদের ঘরেই তুলে নিতে সফল হয়েছে একমাত্র তারাই সুবিধা বঞ্চিত, অবহেলিত ও শোষিত জনগনকে আশ্বস্ত করার জন্য মিথ্যা আশার বানী শোনায় যে স্বাধীনতা আমাদেরকে ৪৪ বছরে অনেক কিছু দিয়েছে এবং এ দেশ একদিন সোনার বাংলা হবেই। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় অর্থনৈতিক মুক্তি ও দরিদ্র জনগনের ভাগ্যোন্নয়ন তবে ৪৪ বছরেও কি এ অর্জন সাধিত হয়েছে? এখনও এ দেশের ৩০% লোক দরিদ্র সীমার নীচে বাস করছে, এখনও ১০% লোক এক বেলা না খেয়ে বা অর্ধহারে জীবন কাটাচ্ছে। গোলাভরা ধান, নবান্ন উৎসব, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছ বাংলার এ ঐতিহ্য এখন কেবল সোনালী অতীত, জনসংখ্যার ৬০ ভাগ কৃষকের মৃতপ্রায় কংকালসার দেহটাই কেবল অবশিষ্ট আছে। হারভাঙ্গা পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়ে ক্ষমতাসীনদের গর্ব করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন হওয়ার কথা বলার সুযোগ করে দিলেও কৃষকরা কৃষিপন্যের ন্যায্য মূল্য পায়না, মনের দু:খে অনেক সময় ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই নষ্ট করে দেয়। নদ-নদী, খাল-বিল দখল করে শুকিয়ে মেরে ফেলার কারণে, পাহাড়, বন-জঙ্গল, পশু-পাখি উজার ও বিলীন করে দিয়ে বাংলার রূপ, ষড়ঋতু, সম্পদ ও প্রকৃতিকে নিয়ে রাজনীতিবিদরা স্বাধীনতার পূর্বে বাংলার জনগনকে সোনার বাংলার যে স্বপ্ন দেখাত তার পরিবর্তে বাংলা এখন প্রকৃত অর্থে স্মশানে পরিনত হয়েছে। এ ব্যর্থতা কার, জনগনের না কি যারা জনগনকে আরো সুখে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেই রাজনীতিবিদ তথা শাসক শ্রেনীর? স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের গনতান্ত্রিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পাকিস্তানী শাসক গোষ্টি বাংগালীকে যে অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর আজ কি আমরা বলতে পারব বাংলাদেশে এখন প্রকৃত অর্থে মানুষের গনতান্ত্রিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে? একটা স্বাধীন দেশের কাছে জনগনের মৌলিক চাহিদা বা সাংবিধানিক অধিকার হলো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সাথে জনগনের জান-মালের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা। ৪৩ বছরের শাসনামলে জনগনের এই মৌলিক চাহিদা বা অধিকারগুলো কি আজো পূরন হয়েছে? স্বাধীনতা পূববর্তি অবস্থায় মানুষ রাতের বেলায়ও দরজা খুলে ঘুমাতে পেরেছে, আর এখন দিনের বেলাতেও খোদ রাজধানীতে দরজা বন্ধ করেও জান-মাল নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নাই, রাস্তাঘাটে নির্ভয়ে চলাচল করা যায়না, এই হলো জান-মালের নিরাপত্তার অবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, পাশের হারও অলৌকিকভাবে বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান নিন্মমূখী হয়েছে, এছাড়াও বার বার ঘটছে প্রশ্নপত্র ফাসের ঘটনা। স্বাধীনতার পূর্বে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল, আজ ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের গর্ব করার মত কোন অবস্থা নাই। ছাত্র/ছাত্রী বল্লে ধারনা বা মনে হয় হাতে বই, খাতা ও কলম, কিন্তু এখন তাদের হাতে লাঠি, রড, চাপাতি, রাম দা, পিস্তল, সর্ট-গান, ইত্যাদি ভয়ানক মারনাস্ত্র। আগে ছাত্ররা রাজনীতি করেছে দেশের স্বার্থে, গনতন্ত্রের স্বার্থে , ছাত্রদের নিজস্ব স্বার্থে, কিন্তু এখন ছাত্ররা দলীয় লেজুরবৃত্তি করছে, ভর্তি বানিজ্য, সীট বানিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত, এ নিয়ে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাস আর খুনাখুনিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রনক্ষেত্রে পরিনত করেছে। দেশের ভবিষ্যত হিসেবে তাদের ভাল ছাত্র হওয়ার সময় কোথায় ? দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এখন আগের মত নাই, শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতেও এখন শিক্ষার্থীদের কোন অপরাধ বোধ জাগ্রত হয়না। অবাধ তথ্য প্রবাহ ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে ঘরে ঘরে এখন মা-বাবা ও বড় ভাই-বোনদের সাথে সন্তান ও ছোটদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসার মধ্যে ফাটল ও কৃত্রিমতা দেখা দিয়েছে। স্বাধীন দেশে এখন বাংগালীরাই বাংগালী মা-বোনদের ইজ্জত সম্ভ্রম নষ্ট করছে, যা স্বাধীনতা যুদ্ধকালে রাজাকার আল-বদরদের কার্যকলাপের সাথে তুলনা করার মত। তখনতো একটা দখলদার বা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম বা যুদ্ধরত অবস্থায় বাংলার মা-বোনদের ইজ্জ্ত বিসর্জন দিতে হয়েছিল, কিন্তু এখন কোন্ দখলদার? এখনতো বাংগালীরাই বাংলাকে শাসন করছে? হিসাব এখন স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতি বছর যে পরিমান, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপের মত নারী নির্যাতনের মত নৃশংস ঘটনা ঘটছে তা মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসের ঘটনাকেও ম্লান করে দিচ্ছে। স্বাধীনতার চেতনা বা অর্থ যদি হয়ে থাকে শোষণমুক্ত সমাজ কায়েম করা তবে ৪৩ বছরে এ শোষণের মাত্রা আরো তীব্রতর হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে বলা হতো ২২ পরিবার সাধারন বাংগালীদেরকে শোষণ করছে, স্বাধীনতার পর এখন ২২ লাখেরও বেশী পরিবার বা শোষক শ্রেনী তৈরী হয়েছে। যে যেভাবে পারছে জনগনকে শোষণ করছে, জনগনকে জিম্মি করে, সিন্ডিকেট গঠন করে অতি মুনাফা আদায়ের মাধ্যমে মানুষের দূর্ভোগ ও দূরাবস্থা বৃদ্ধি করছে। সরকারও এখন বিভিন্নভাবে সাধারন জনগনকে শোসন করছে, এই হলো আমাদের দেশপ্রেম এবং স্বাধীন দেশে মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা। দূর্নীতিতে সারা দেশ ডুবে গেছে, স্বাধীনতার পর পর বিদেশ থেকে যে সাহায্য এসেছে তা নিয়ে ব্যাপক দূর্নীতির কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন বাংলাদেশকে “তলাবিহীন ঝুড়ি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। দূর্নীতির পরবর্তি ইতিহাস আরো করুন। স্বাধীন বাংলাদেশ দূর্নীতিতে পর পর ৫ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল, এখনও দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে চাচ্ছেনা। দূর্নীতি দমন কমিশন হিসেবে একটা ঠুঠো জগন্নাথ প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার একে দিয়ে দূর্নীতি দমন করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে ব্যবহার করছে। থানার একজন ওসি (পুলিশের ইন্সপেক্টর) ১ কোটি টাকা দিয়ে ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট কিনছে, কোরবানীর ঈদের সময় নাম ফাটানো বা টাকার গরম দেখানোর উদ্দেশ্যে ৩ লাখ টাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় গরুটা বা ৫/৬ টা গরু কোরবানী যারা দেয়, গরীব দেশের রাজধানী ঢাকার রাজপথে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী বিলাসবহুল গাড়ি নামানোর ধৃষ্ঠতা দেখায় তাদের আয়ের উৎস বা দূর্নীতি নিয়ে দূর্নীতি দমন কমিশনের কোন মাথা ব্যথা নাই। এমন কোন জায়গা বা প্রতিষ্ঠান নাই যে দূর্নীতিমুক্ত আছে। সাংবাদিকরাও মিথ্যা খবর ছাপিয়ে ব্ল্যাক-মেইলিং করে টাকা রোজগার করছে, বিচার বিভাগে আহণজীবি, হাকিম, পেস্কার মিলে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট, টাকার বিনিময়ে বিচারের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে। বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করা তথা স্বাধীন করার সুন্দর নাটক জনগনকে উপহার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নমুনা জনগন হারে হারে টের পাচ্ছে। আইণজীবি, ডাক্তার, শিক্ষক সব এখন দলীয় রাজনীতিতে দূষিত হয়ে গেছে। খাদ্যে ভেজাল এখন দেশের জনগনের জন্য মহামারিতে পরিনত হয়েছে, শাক-সব্জি, ফল-মুল, মাছ-মাংশ অর্থাৎ এমন কোন খাদ্য নাই (এমনকি ঔষধসহ) আজ ভেজালমুক্ত। অথচ সোনার বাংলার স্বপ্ন এমন ছিলনা। স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকার উন্নয়নের জন্য ডি,আই,টি ছিল, ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর রাজউক হয়েছে, কিন্তু এখন ঢাকা শহরকে একটা অপরিকল্পিত মেগা বস্তির (মেগা সিটি নয়) শহর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, প্রত্যেকটা মন্ত্রনালয় বা বিভাগের জন্য সুরম্য ভবন তৈরী করা হয়েছে, লোকবলও সব আছে কিন্তু নাই স্বাধীন দেশের তথা জনগনের স্বার্থে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালন করার মত কর্মকর্তা ও কর্মচারী। সরকারের সব বিভাগ, দপ্তর, হাতিয়ার ও আইণ থাকা সত্ত্বেও ৪৪ বছরে দেশের সব পুকুর-ডোবা, খাল-বিল অবৈধ দখলকারীরা ভরাট করে ফেলেছে, এমনকি নদীও ভরাট করে বাংলাদেশকে মেরে ফেলার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে, ভুমি দস্যুরা পাহাড় কেটে, বনদস্যুরা গাছ কেটে বাংলাদেশের প্রকৃতিকেই ধ্বংশ করে দিচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে কল-কারখানা গড়ে তুলে দেশের আবাদযোগ্য কৃষি জমি, মৎস উৎপাদন ক্ষেত্র সব গ্রাস করে ফেলছে, আর কিছুদিন পর ফসল ফলানো ও মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্র/জলাশয় আর থাকবেনা। ইতমধ্যে এ দেশের ২২ প্রজাতির মাছ বিলিন হয়ে গেছে। অথচ এসব রোধ করার জন্য সরকারের বা শাসকদের সব দপ্তর-বিভাগ ও লোকবল বহাল আছে। বাংলাদেশ বিমানকে ও রেলওয়েকে আজো একটা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করা যায়নি অথচ বলাকা ভবন, রেল ভবন, যোগাযোগ ভবন নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এ সবের অফিস বানানো হয়েছে। যে জাতির দেশ ও মানুষের জন্য দেশপ্রেম ও ভালোবাসা নাই সে জাতি স্বাধীনতার মর্যাদা বুঝবে কিভাবে ? এহেন কর্মকান্ড আসলে আমাদের স্বাধীনতার লজ্জা ছাড়া আর কি? তবে স্বাধীনতার পর যে ক্ষেত্রে আমাদের ভয়াবহ উন্নতি বা অর্জন হয়েছে তা হলো ৭.৫ কোটি জনসংখ্যাকে আমরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে বৃদ্ধি করে ১৬ কোটিরও বেশীতে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। ছোট আয়তনের এই দেশটাতে এই মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যাই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বা অভিশাপ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ গতি বা ধারা চলতে থাকলে আর ১০ বা ২০ বছর পর হয়ত পুরো বাংলাদেশকেই গিলে ফেলবে। সর্বক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ও অশুভ বা নোংরা প্রতিযোগিতা এবং এ নিয়ে হানাহানি, সন্ত্রাস সব কিছুই একমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ঘটছে। অপরদিকে এই বিশাল জনসংখ্যাই স্বাধীন বাংলাদেশে অনেকের জন্য আশির্বাদ বা যেটাকে আমাদের উন্নতি বা প্রগতির প্রমান হিসাবে বলতে চাই। এই বাড়তি জনসংখ্যার কারণে দেশের বা কিছু সংখ্যক লোকের যেসব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে তা হলো:- বাঁচার তাগিদে লোকজনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে, চলাচল বা যাতায়াতের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে, লোকজনের চলাচলের জন্য হাজার হাজার যানবাহন রাস্তায় নেমেছে (গাড়ি ব্যবসার প্রসার ঘটেছে), বাসস্থানের জন্য ঘর-বাড়ি, বিল্ডিং-এপার্টমেন্ট তৈরী হয়েছে ও হচ্ছে (রিয়েল-ইস্টেট ব্যবসার প্রসার ঘটেছে), থাকা-খাওয়ার জন্য হাজার হাজার হোটেল রেস্টুরেন্ট তৈরী হয়েছে, লাখ লাখ বেকার সৃষ্টি হওয়ায় সস্তা শ্রমের উপর নির্ভর করে শত শত গার্মেন্টস বা পোষাক শিল্প গড়ে উঠেছে, দেশে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান নাই বলে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী খাত গড়ে উঠেছে (যে খাতের আয় দিয়ে এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রার রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে)। অর্থাৎ বাড়তি জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে যেসব খাত ও ব্যবসা-বানিজ্য গড়ে উঠেছে এটাকেই যদি আমাদের উন্নতি ও অগ্রগতি ধরা হয় তাহেলেতো জনসংখ্যা কমানোর পরিবর্তে আরো বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বাধীনতার আগে যখন এ দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭.৫ কোটি (যখন জনসংখ্যা সমস্যা এত প্রকট ছিলনা) তখনকার শাসক গোষ্টিও জনসংখ্যা কমানোর বা জন্ম নিয়ন্ত্রনের জন্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু করেছিল, সেই পাকিস্তান আমলেই রাজা কনডম ও মায়া বড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন সরকারই জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এ বিষয়ে কোন কার্যকর ও জরুরী পরিকল্পনা বা কর্মসূচি গ্রহন করছেনা। সবাই ৪৩ বছর পরেও ব্যস্ত আছে স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঘোষক নির্ধারন নিয়ে, নাম ফলক মুছামুছি বা ভেঙ্গে ফেলার কাজ নিয়ে। কে কাকে ফেলে দিয়ে ক্ষমতায় যাবে এবং ক্ষমতা ধরে রাখবে এই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি দেখলে, টিভি চ্যানেলের টক-শো’গুলো দেখলে, সভা, সেমিনারের আলোচনা দেখলে মনে হয় এ দেশে বিশেষজ্ঞ, বিশারদ, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষাবিদ, গবেষক অর্থাৎ পন্ডিতের ছড়াছড়ি (কোন অভাব নাই)। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও দেশের জন্য যুগোপযোগি একটা শিক্ষা নীতি প্রনীত হয় নাই, গনমাধ্যমের জন্য আজো একটা গ্রনযোগ্য নীতিমালা প্রনীত হয় নাই, চাঁদাবাজি ও যানজটে দেশের মানুষের বেহাল অবস্থা তবুও একটা পরিবহন নীতি প্রনীত হচ্ছেনা, সশস্ত্র বাহিনীর যে কোন অনুষ্ঠানে গেলেই শুধু সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনার কথা বলা হয়ে থাকে কিন্তু স্বাধীন দেশের জন্য একটা প্রতিরক্ষা নীতি আজ পর্যন্ত প্রনয়ন করা সম্ভব হয়নি। অথচ অপরিকল্পিত ও অযৌক্তিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয় করে গরীব দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা নষ্ট করা হচ্ছে (আমরা প্রতিবেশী কার সাথে যুদ্ধ করব বা যুদ্ধ করার ক্ষমতা অর্জন করব? এমন আরো বহু ক্ষেত্র রয়েছে ৪৩ বছরেও যেখানে কোন শৃংখলা ও নিয়ম-নীতি অনুসরনের জন্য নীতিমালা বা বিধি-বিধান প্রনয়ন করা হয় নাই। হবে কিভাবে? কোন ব্যাপারেই জাতীয় ঐক্যমত নাই, রাজনীতিবিদদের মত এ দেশের পন্ডিত/বিশেষজ্ঞরাও সংকীর্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দলাদলিতে বিভক্ত, যাদের পছন্দের দল ক্ষমতায় আসে সেভাবে বুদ্ধি পরামর্শ দেয় বা পরিকল্পনা গ্রহন করে, আবার সরকার পরিবর্তন হয়ে গেলে আর এক দলের অনুসারীরা তা পরিবর্তন করে দেয়, এ খেলাই চলছে বিগত ৪৩ বছর যাবত। একটা স্বাধীন দেশের উন্নতি, অগ্রগতি তথা অস্তিত্ব নির্ভর করে মূলত সে দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের উপর, শুধু জনসম্পদের উপর নির্ভর করে একটা দেশ টিকে থাকতে বা উন্নতি করতে পারেনা, তাছাড়া জনগনকেও দেশের উন্নয়নের জন্য দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত করে জনসম্পদে পরিনত করা প্রয়োজন, তাহলে বাড়তি জনসংখ্যাকে দেশের জন্য বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কিন্তু বিগত ৪৩ বছরে আমাদের রাজনীতিবিদ তথা শাসকরা জনগনকেও দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত করার পরিবর্তে তাদেরকে সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে হিংস্র, উশৃংখল ও অসহিষ্ণু আচরনে দিক্ষিত করে তুলছে, যার নমুনা বা স্বাক্ষর যেমন দেশেও প্রতিফলিত হচ্ছে (দাবী আদায়ের নামে আন্দোলন, জ্বালাও, পোড়াও, ভাংচুর, লুটপাট) তেমনি বাংলাদেশী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়েও একই আচরন করছে। ফলে এখন বহু দেশ বাংলাদেশী জনশক্তি আমদানী বন্ধ করে দিয়েছে। বাংগালীরা নিকৃষ্ট বা খারপ জাতি নয়, যারা বিদেশে জন্মলাভ করে, বিদেশে লেখা-পড়া শিখে বিদেশে কর্মরত আছে বা বসবাস করছে অর্থাৎ বাংলাদেশের বাইরে ভিন্ন পরিবেশে বড় হচ্ছে তারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে পিছিয়ে নাই, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় অবদান রাখছে, বাংগালী ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মধ্যে লালিত পালিত হয়ে যারা বড় হচ্ছে তারা দেশের রাজনীতিবিদ ও শাসকদের সহিংস রাজনীতি, অসুস্থ সামাজিক পরিবেশ ও নৈতিকতা বিরোধী কর্মকান্ড ও মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত বিষাক্ত ছায়ায় বেড়ে উঠছে বা বড় হচ্ছে বলে তারা সভ্য, ভদ্র, সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত বাংগালী হয়ে গড়ে উঠতে পারছেনা। এজন্য দায়ী জনগন নয়-দায়ী এদেশের রাজনীতিবিদ ও শাসক সমাজ। তদানিন্তন পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নতি বহুলাংশে নির্ভর করত পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) পাট, চা, চামড়া অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের উপর, এটাই স্বাধীনতা পূর্ববর্তি সময়ে আমাদের নেতারা আমাদেরকে বুঝিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমরা এসব সম্পদের একক মালিক হওয়া সত্তেও বিগত ৪৩ বছরে এসব সম্পদ দিয়ে দেশ ও জনগনের কোন উন্নতি করাতো দূরের কথা এসব সম্পদকেই ধ্বংশ ও মৃতপ্রায় অবস্থায় পরিনত করেছি, এর জন্য নিশ্চয়ই এ দেশের সাধারন জনগন দায়ী নয়, যারা ৪৩ বছর যাবত দেশ শাসন করছে তারাই দায়ী। ইউরোপ ও আমেরিকায় আজ তৈরী পোষাকের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমরা গার্মেন্টস পন্য রপ্তানী করতে পারছি, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ তাদের দেশের উন্নয়নের জন্য জনশক্তির উপর নির্ভরশীল হয়েছে বলে আমরা সেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানী করতে পারছি। তা না হলে দেশের কোটি কোটি বেকার মানুষের (নারী-পুরুষ) তথা দেশের কি অবস্থা দত? শুধু স্বাধীনতার পতাকা হাতে নিয়ে দেশটার বুকে দাড়িয়ে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” বলে জাতীয় সংগীত গাইলেই কি চলত বা সোনার বাংলা কায়েম হয়ে যাবে? আজ বিদ্যুৎ নাই, পানি নাই, গ্যাস নাই, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব সমস্যার সমাধানে কোন উদ্যোগ বা অগ্রগতি নাই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জ্বালানী/বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকায় এবং দেশের সার্বিক আইণ-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশংকায় দেশে স্থানীয়ভাবে বা কোন বৈদেশিক বিনিয়োগও হচ্ছেনা। সব ব্যর্থতার জন্য শুধু এক সরকার আর এক সরকারকে দায়ী করার রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। পাট, চা, চামড়া, অফুরন্ত পানি সম্পদ, গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ থাকা সত্তেও সঠিক পরিকল্পনা ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে নিজস্ব সম্পদের উপর ভিত্তি করে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, দেশ্রপমিক, সৎ ও যোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা শাসক নাই বলেই ৪৩ বছরেও বাংলাদেশের কাংখিত অগ্রগতি হয়নি। সোনার বাংলার প্রকৃত চেহারা মনে ধারন করার চেষ্টা করলে স্বাধীনতার পূর্বে যে বাংলার রূপ মনে ও স্মৃতিতে ভেসে উঠার আবেগে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম আজকের বাংলাদেশের রূপ ও চেহারার সাথে তুলনা করলে তাকে রুক্ষ শুষ্ক শ্মসানের মতই মনে হয়। রবিন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে যেমনটি বলেছিলেন, “বাংগালী করেছ কিন্তু মানুষ করোনি” তেমনিভাবে আমাদেরকেও বলতে হয় “শেখ মুজিব ও লাখো বীর মুক্তিযোদ্ধারা তোমরা আমাদেরকে একটা স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছ, কিন্তু সোনার বাংলা কায়েম করা তথা দেশ চালানোর মত যোগ্য শাসক দিয়ে যাওনি”।৪৩ বছরের ব্যর্থতার দায়ভার ঢাকতে শাসক গোষ্টি ও এর দোষররা বলে থাকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখলে এই উন্নতিকে তুলনা করতে হয় ভবনের ভেতরের ইট সিমেন্ট ও রডের জীর্ন দশাকে ঢাকতে উপরে রং-চুন দিয়ে চকচক করে রাখার মত। স্বাধীন দেশের কাছে প্রত্যাশিত জনগনের মৌলিক অধিকারের কি একটুও পূরন হয়েছে? একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্যতম ও প্রধান দায়িত্বই হলো মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা, বাংলাদেশে কি আজ তা আছে? বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় ঘরে-বাইরে মানুষের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। রাষ্ট্রের তথা বিচার বিভাগের কাছে মানুষ বিচার তথা ন্যয় বিচার প্রত্যাশা করে, বাংলাদেশে মানুষ কি আজ তা পাচ্ছে? বাংলাদেশে কি আজ আইণের শাসন (২/১টা ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া) আছে নাকি শাসকের আইণে এখন দেশ চলছে? দেশে কি আজ সুশাসন আছে নাকি রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত প্রশাসন দ্বারা দেশে কুশাসন কায়েম করা হয়েছে? পুলিশকে বলা হয় জনগনের বন্ধু, কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ কি আজ জনগনের বন্ধুর মত আচরন করছে? বাংলাদেশের পুলিশকে এখন বলা হয় সকল দূর্নীতির মাতা, ঘুষ খেয়ে বাদীকে আসামী বানাচ্ছে, আসামীকে বাদী বানাচ্ছে, অবৈধ টাকা উপার্জনের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের গ্রেফতার বানিজ্য এখন সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বিচার বহির্ভূত ও টাকার বিনিময়ে মানুষ গুম ও হত্যা করা এখন বাংলাদেশের আইণ-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কোন শাখার অনেক সদস্যেরই মনে হয় নিয়মিত দায়িত্বে পরিনত হয়েছে, যা বাংলাদেশে এখন মানবিধার লংঘনের ঘটনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সকল ক্ষেত্রে দূর্নীতির সর্বগ্রাসী থাবায় জনজীবন অতিষ্ট ও অসহায় হয়ে গেছে। শাক দিয়ে যেমন মাছ ঢাকা যায়না তেমনি সাধারন মানুষের কাছে যেসবের কোন মূল্য নাই বা জনজীবনে যার কোন প্রভাব বা সুফলের চিহ্নও খুজে পাওয়া যায়না সেসব সূচক ও প্রবৃদ্ধির গান গেয়ে আর যাই হউক ৪৩ বছর সময় পেয়েও দেশকে সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলায় পরিনত করার বা গড়ে তোলার ব্যর্থতা ও গ্লানিকে আড়াল করা যাবেনা। আর এভাবেই যদি চলতে থাকে তবে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটা মধ্য আয়ের দেশে পরিনত করার মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে শাসক দল হয়ত ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস বা কৌশল চালাতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিনত করার স্বপ্ন সেই স্বাধীনতা পূর্ববর্তি স্বপ্নের মতই দু:স্বপ্ন হয়েই থাকবে। লেখক : জাহিদ হাসান, রিয়াদ, সউদী আরব

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *