গাজীপুরে এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্ক

কাজী আশরাফ :- ঢাকা থেকে ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল গড়ের দূরত্ব মাত্র ৪০ কি.মি.। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এই স্থানটি সব সময়ই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। এমন একটি জায়গায় সাফারি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে জানতে পেরে তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বন্ধু মনিরকে প্রস্তাব দিতেই সে রাজি হয়ে গেল। দুই বন্ধু মিলে রওনা হলাম সকালবেলা। বাসে যেতে যেতে শুনছিলাম সাফারি পার্কের ইতিহাসের কথা। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছিল ভাওয়াল গড়ের ঐতিহ্য। হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমানে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। জানলাম, এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্ক। ৩৬৯০ একর জায়গা নিয়ে উন্নত বিশ্বের আধুনিক সাফারি পার্কের ন্যায় এটি তৈরি করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথম ভাওয়াল গড়কে ‘জাতীয় উদ্যান’ ঘোষণা করেন। এ কারণে এ উদ্যানের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন এই জাতীয় উদ্যানটিকে চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করবেন। কিন্তু কালের আবর্তে এ উদ্যানের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে থাকে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ এশীয় মডেলে বিশেষ করে থাইল্যান্ডের আদলে ২০১০ সালে নতুন করে উদ্যানের কাজ শুরু হয়। পার্কে ১২২৫ একর জায়গা নিয়ে কোর সাফারি, ৫৬৬ একর জায়গা নিয়ে সাফারি কিংডম, ৮২০ একর জায়গা নিয়ে বায়োডাইভার্সিটি, ৭৬৯ একর এলাকা নিয়ে এক্সটেন্সিভ এশিয়ান সাফারি এবং ৩৮ একর এলাকা নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। পার্কে বন ও অবমুক্ত প্রাণীর নিরাপত্তার জন্য ২৬ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটক গাড়িতে বসে বিচরণ অবস্থায় বন্যপ্রাণী অবলোকন করতে পারেন। পার্কে বাঘ, সিংহ, ভালুক চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, জেব্রা, জিরাফ, ওয়াইল্ডবিষ্ট, ব্লেসবক, উটপাখি, ইমু প্রভৃতি অবমুক্ত করা হয়েছে। বন ও প্রাণী বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য সেখানে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিকমানের প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র। এছাড়া তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র, নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম, পার্ক অফিস, বিশ্রামাগার, ডরমেটরি, বন্যপ্রাণী হাসপাতাল, কুমিরপার্ক, লিজার্ড পার্ক, ফেন্সি ডাক গার্ডেন, ক্রাউন ফিজেন্ট এভিয়ারি, প্যারট এভিয়ারি, ধনেশ পাখিশালা, ম্যাকাউ ল্যান্ড, মেরিন একোয়ারিয়াম, অর্কিড হাউস, প্রজাপ্রতি বাগান, ঝুলন্ত ব্রিজ, বাঘ পর্যবেক্ষণ রেস্তরাঁ, সিংহ পর্যবেক্ষণ রেস্তরাঁ, কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র, ইকো রিসোর্ট, ফুডকোর্ট, এলিফেন্ট শো গ্যালারি, বার্ড শো গ্যালারি, এগ ওয়ার্ল্ড ও শিশু পার্ক রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য রয়েছে বাস ও সাফারি জীপ। বাঘ ও সিংহের বেষ্টনীতে সাফারি বাস ও জীপে পর্যটকরা প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণরত বাঘ, সিংহ ও ভালুক দেখতে পারবেন। এছাড়াও  দেখা যাবে জিরাফ, জেব্রা, ব্লু ওয়াইল্ড বিস্ট, ব্ল্যাক ওয়াইল্ড বিস্ট, ব্লেস বকসহ বিভিন্ন প্রাণী। আমরা কিন্তু সেখানে গিয়ে বাঘ দেখতে পাইনি। কপাল মন্দ হলে যা হয়! সহযাত্রী অনেকের মুখেই শুনলাম এই আফসোসের কথা। বুঝতে পারলাম, এই পার্কের বড় আকর্ষণ হলো, মুক্ত বনে বাঘ ঘুড়ে বেড়াচ্ছে সেটা দেখা। যদিও এ সৌভাগ্য অনেকেরই হয় না। যেমন আমাদের হলো না। মনির বলল, চল ফিরে যাই। প্রচণ্ড রোদ। মানুষের কোলাহলও বেশ। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ছুটির দিন বেশি ভিড় হয়। ঢাকা থেকে দূরত্ব বেশি নয় বলে সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসা যায়। পার্কে প্রবেশ ফি:- প্রবেশ ফি একেক জনের জন্য একেক রকম। বয়স্কদের জন্য ৫০টাকা, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ২০ টাকা, শিক্ষার্থীদের ১০ টাকা, শিক্ষা সফরে আসা শিক্ষার্থী গ্রুপ ৪০ থেকে ১০০ জন ৪০০ টাকা, আর যদি শিক্ষার্থী গ্রুপ ১০০ জনের বেশি হয় তাহলে ৮০০ টাকা এবং  বিদেশি পর্যটকদের জন্য পাঁচ ইউএস ডলার। কিন্তু এই প্রবেশ ফি দিয়ে পার্কে ঢুকলেই যে আপনি সব দেখতে পাবেন তা কিন্তু নয়, পার্কে প্রবেশের পর সবকিছু দেখার জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হবে। যেমন ধরুন গাড়িতে সাফারি পার্ক পরিদর্শন করতে চাইলে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য লাগবে ৫০ টাকা, বড়দের ১০০ টাকা। এ ছাড়া ক্রাউন্ড ফিজ্যান্ট এভিয়ারি পরিদর্শন ১০ টাকা, ধনেশ এভিয়ারি ১০ টাকা, প্যারট এভিয়ারি ১০ টাকা। আপনি যদি এগুলো না দেখতে চান তাহলে উদ্যানের মধ্যে সবুজ ছায়ায় মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এ জন্য অবশ্য আপনাকে বাড়তি টাকা দিতে হবে না। ঘুরে ঘুরে বন দেখারও আলাদা মজা আছে। মাথার ওপর সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলোয় দেখা পথ ধরে চলতে চলতে হরিণ দেখাটা আনন্দদায়কই বটে! তবে সমস্যা হলো পুরো উদ্যানের কাজ এখনও শেষ হয়নি। আর বিকেলের পর সেখানে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সে কারণে আমাদের ফিরতেই হলো। পার্কের মধ্যে কফি পান করে তেষ্টা মেটানোর ইচ্ছা হলো না। কারণ সেখানে সবকিছুর গলাকাটা দাম। পার্ক থেকে বেরিয়ে একটা দোকানে বসে কফির অর্ডার দিলাম। মুখে দিয়ে মনে হলো গুড়ের শরবত! দাম দেয়ার সময় আরেকবার হোঁচট খেলাম। কারণ দামটা ঢাকার চেয়েও বেশি! যাবেন যেভাবে:- মহাখালী থেকে ভালুকা, ময়মনসিংহ বা শ্রীপুরের বাসে উঠে পরুন। গাজীপুরের বাঘের বাজার নেমে যাবেন। জ্যাম বিবেচনা সাপেক্ষে ২ ঘণ্টা লাগবে। বাস থেকে নেমে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় পার্কে যাওয়া যাবে। সময় লাগবে মাত্র ২০ মিনিট।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *