জেনে নিন কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের নিয়ম

02 (4)প্রথম সকাল ডট কম ডেস্ক: দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় একটি বড় খাত চামড়া শিল্প। ২০১৩-১৪  অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ৫১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। ক্ষতির সস্মুখীন হন হাজারো ব্যবসায়ী। সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানোর কৌশল এবং তা সংরক্ষণের নিয়ম না জানার কারনেই চামড়া নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চামড়া ছাড়ানোর কৌশল সর্ম্পকে কথা হয় কসাই আব্দুল আউয়ালে সঙ্গে। তিনি জানান, যে পশুর চামড়া ছাড়াতে চান সেটা যদি ছোট হয় তাহলে দড়ি দিয়ে সেটাকে শক্ত কোনো খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে দিতে হবে। এরপর জবাই করা স্থান থেকে ছুরি দিয়ে ধীরে ধীরে আলগা ভাবে চামড়া ছাড়িয়ে নিচে নামতে হবে। প্রথমে ওপরের দিকে দুটি পা থেকে শুরু করে নিচের পা দুটিতেও একইভাবে ছাড়াতে হবে। অনেকেই চামড়া ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়ার পর টেনে টেনে নিচের দিকে নামাতে থাকেন। কিন্তু এতে অনেক সময় চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে। আউয়াল বলেন, ‘ছাগলের চামড়া আলাদা করার সময় পায়ের নিচের অংশ কেটে ফুঁ দিয়ে বা পাম্প করে ফুলিয়ে নেবেন, তাহলে চামড়া ছাড়াতে আপনাকে বেশি বেগ পেতে হবে না; চামড়া ভালো থাকবে। গরুর চামড়া ছাড়ানোর সময় পানি ও ধারালো ছুরি ব্যবহার করবেন। ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করলে চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে। চামড়া ছাড়ানোর পর অনেকেই তা যেনতেনভাবে মাটিতে ফেলে রাখেন। একটু সময় করে ভাঁজ করে রাখুন। পানি লাগানোর প্রয়োজন নেই। ছাগল বা গরুর মাথার চামড়াও মূল্যবান। এটি আলাদা করার সময় অবহেলা করা উচিত নয়। চামড়া ছাড়ানোর পরে কী করতে হবে- এ প্রশ্নের জবাবে আরেকজন কসাই আদুল লতিফ বলেন, ‘চামড়ার সঙ্গে লেগে থাকা চর্বি অপসারণ করতে হবে। তবে তা বিশেষ কায়দায় ধারালো ছুরি দিয়ে ধীরে ধীরে করতে হবে। এরপর চামড়া পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে, হালকা রোদে দিয়ে পানি শুকিয়ে নিতে হবে। পানি সরে গেলে চামড়া গাঁট বেঁধে নির্দিষ্ট স্থানে বা পাইকারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এতে ঝামেলা ও ঝুঁকি কম হবে। তিনি বলেন, ‘চামড়া ছাড়ানোর পর সাত থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি করা না গেলে সংরক্ষণ করতে হবে। গরমকালে দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে এবং শীতকালে চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চামড়া সংরক্ষণের নানা পদ্ধতির মধ্যে আছে লবণ দিয়ে রোদে শুকানো এবং হিমাগারে সংরক্ষণ। তবে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি লবণ দিয়ে রোদে শুকানো। লবণ পদ্ধতি : চামড়ার ধরন বুঝে মাংসল স্থানে লবণ মাখিয়ে এর গুণাগুণ ঠিক রাখা সম্ভব। গরু বা মহিষের চামড়ার ক্ষেত্রে নাগরা সোল চামড়ায় তিন থেকে পাঁচ কেজি, ঢিলা চামড়ায় দুই থেকে চার কেজি এবং কুরুম চামড়ায় দেড় থেকে তিন কেজি লবণ লাগাতে হবে। ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার ক্ষেত্রে স্টার চামড়ায় আধা কেজি, হেভি ও মেল চামড়ায় ২৫০ গ্রাম লবণ দিতে হবে। এভাবে লবণ মাখিয়ে চামড়াগুলো ভাঁজ করে একটির ওপর আরেকটি স্তূপাকারে রাখা হয়। লবণের পর্যাপ্ততা না থাকলে লবণ ও পানির মিশ্রণের সাহায্যেও চামড়াকে কিছুদিনের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রোদে শুকানো : চামড়া অনেকভাবে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। যেমন- কোনো খোলা মাঠে বা খোলা মেঝেতে বিছিয়ে রেখে; কোনো খোলা স্থানে তারের সাহায্যে ঝুলিয়ে এবং কোনো খোলা মাঠ বা খোলা স্থানে বাঁশের তৈরি ফ্রেমের সঙ্গে বেঁধে চামড়া শুকানো যায়। তবে রোদে শুকানো চামড়ার কিছু কিছু অসুবিধাও রয়েছে। রোদে শুকালে চামড়ার গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ সবচেয়ে সহজ ও সুবিধাজনক উপায়। হিমাগারে সংরক্ষণ : চামড়া সংরক্ষণের জন্য বড় ট্যানারিগুলোয় একটা করে হিমাগার থাকে, যেখানে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। চামড়া সংরক্ষণের প্রধান কারণ হলো যেন পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিক্রি করে বেশি টাকা আয় করা যায়। ব্যাকটেরিয়া অথবা অন্য কোনো কীটপতঙ্গের সংক্রমণের হাত থেকে চামড়া রক্ষা করার জন্য কিছু ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক রাসায়নিক পদার্থ লবণের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট সভাপতি আলী হোসেন জানান, ভারতীয় লবণে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম দ্রব্য মিশ্রিত থাকে। ফলে লবণের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে কাঁচা চামড়ায় ভারতীয় লবণ ব্যবহার না করাই শ্রেয়। দেশীয় লবণে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য না থাকায় তা চামড়া সংরক্ষণের জন্য খুবই কার্যকর।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *