পাঁচ সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ

054 (1)প্রথম সকাল ডট কম ডেস্ক: পাঁচ সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাই ওই পাঁচ আমলার মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও এ সংক্রান্ত গেজেট বাতিলের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। মঙ্গলবার সকালে বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক নূর আহমেদের কাছ থেকে কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নিকট অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও দুদকের উপ-পরিচালক জুলফিকার আলী পরিচালক নূর আহমেদের নিকট জমা দিয়েছিলেন। পরে এই পরিচালকের কাছ থেকে যাচাই-বাছাইয়ের শেষে সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের মাধ্যমে বুধবার কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র শীর্ষ নিউজ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি জানায়, দুদকের অনুসন্ধানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের দায়ে অভিযুক্ত ছয় সচিবের মধ্যে পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের বিষয়টি প্রামণিত হয়েছে। ওই সচিবরা হলেন- বিনিয়োগ বোর্ডের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (ওএসডি) সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকী, একই মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি হওয়া যুগ্ম-সচিব আবুল কাসেম তালুকদার, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব একেএম আমির হোসেন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব নিয়াজউদ্দিন মিঞা। তবে অভিযুক্ত আরেকজন প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পায়নি। তাই তাকে এই অভিযোগে সন্দেহাতীতভাবে রেখে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অপরদিকে বাকি পাঁচ সচিব একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাময়িক সনদ গ্রহণ করায় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল ২০০২ এর ৭ (ঝ) ধারা অনুযায়ী তাদের সনদ বাতিল ও গেজেট থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। তবে সংগৃহীত এই সকল সনদ এখনো পর্যন্ত ব্যবহার না করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হচ্ছে না। আর এই মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করলে তার সুফলও পাওয়া যাবে না। তবে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী যদি মন্ত্রণালয়গুলো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। দুদকের উপ-পরিচালক জুলফিকার আলী এসব সুপারিশ করে প্রতিবেদনটি বুধবার কমিশনে জমা দিয়েছে। কমিশনের যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন দিলে, সুপারিশসমুহ মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠানো হবে বলে জানায় সূত্রটি। দুদকের অনুসন্ধানে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে: দুদক সূত্র জানায়, ওই পাঁচ সচিবের কেউ মুক্তিযুদ্ধে কোনোভাবে অংশ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অকাট্য কোনো দলিলও তারা দেখাতে পারেননি। তাই দাবি করলেও তারা আদৌ মুক্তিযোদ্ধা নন। তারা যে কাগজপত্রের বলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন সেগুলোর সত্যতা মেলেনি। যে চার মানদণ্ডে মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান করা হয় সেগুলোর একটির আওতায়ও তা পড়েননি। সেগুলো হচ্ছে, ১. যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ২. যাদের নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ৩. মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল। অথবা ৪.মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা প্রধানমন্ত্রীর সই করা সনদ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই সচিবদের সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব মানদণ্ডের কোনোটিই মানা হয়নি। তাদেরকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী স্বাক্ষরিত সনদপত্র দেওয়া হয়েছিল। এদিকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে পাঁচজন সচিবের বয়স ১৪ বা তারও কম ছিল বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমানণ পাওয়া যায়। অপরদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন ১৯৭১ সালে টাঙ্গাইল মির্জাপুর কদিমধলা কাটরা, মাটিয়াচড়া ও ডোলা এলাকায় একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। এমনকি তার নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই তাকে এ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে তিনি চাকরিতে যোগদানকালে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি। যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করার মানদণ্ডগুলোর একটি। তাই তাকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হলেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে রাখা হয়েছে। দুদক সূত্র আরো জানায়, অভিযুক্তদের মধ্যে চারজনের চাকরির মেয়াদই শেষ পর্যায়ে। পূর্ণাঙ্গ সচিব মর্যাদায় মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান চাকরি করছেন চুক্তিভিত্তিক। একেএম আমির হোসেন এবং নিয়াজ উদ্দিন মিঞা চাকরি করছেন পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালে কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকীকে গত মাসে ওএসডি করা হয়। যুগ্ম-সচিব আবুল কাসেম তালুকদারকে ওএসডি করা হয় গত জুলাইয়ে। অভিযোগের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় ৫ সচিব ও এক যুগ্ম-সচিবের ডোসিয়ার, পিডিএস (পার্সোনাল ডাটাশিট), মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাখিলকৃত সনদ, চাকরিতে যোগদানকালে পূরণকৃত ফরমের সত্যায়িত অনুলিপিসহ ৪১৮ পৃষ্ঠার নথি যাচাই করা হয়। উল্লেখ্য, দুদকের উপ-পরিচালক জুলফিকার আলী গত ৬ মাস ধরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের এ অভিযোগটি অনুসন্ধান করেছেন। অনুসন্ধানকালে গত ১৫ জুলাই অভিযুক্ত ওই পাঁচ সচিব ও এক যুগ্ম সচিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। সেই সঙ্গে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক (ডিজি), পরিচালক এবং স্থানীয় পর্যায়ের ডজন খানেক মুক্তিযোদ্ধাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল দুদক।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *