খোলা আকাশের নীচে যাদের কাটে রাত

5456 (6)প্রথম সকাল ডট কম ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে ভাসমান অনেক মানুষকে দেখা যায় ফুটপাথে, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা রেল স্টেশনে ঘুমাতে। ঘরহীন এইসব মানুষের অনেকেরই থাকার কোনও আবাস না থাকায় তারা রাত কাটাতে বেছে নেয় এসব স্থানকে। আবার অনেকের ঘর থাকলেও জীবিকার প্রয়োজন কিংবা অন্য কোনও কারণে বাধ্য হন রাস্তাঘাটে এভাবে জীবন কাটাতে। পথবাসী এইসব মানুষদের নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, এদের জীবনমান উন্নত করতে দরকার বেশকিছু সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। রেল স্টেশনে রাত: ঘড়িতে রাত একটা। এইমাত্র একটি ট্রেন এসে থেমেছে। প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে ঘুমিয়ে আছেন মাথার ওপর ছাদহীন অনেক মানুষ। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন আরো অনেকেই। স্টেশনের ভেতরে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছেন অনেক মানুষ। রাত যতই গভীর হচ্ছ তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। আট নম্বর প্ল্যাটফর্মে দেখা গেল পাশাপাশি শুয়ে আছেন প্রায় দুই-আড়ইশ’ নারী-পুরুষ। জীবিত না মৃত-বোঝা দায়! রেল স্টেশনে এভাবেই রাত কাটে অনেকের। অবশিষ্ট যেটুকু জায়গা খালি আছে সেখানেও ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে শোয়ার আয়োজন করছেন অনেকে। ডেকেরোটরের দোকানে খানশামার কাজ করেন সবুর মিয়া। বাড়ি দিনাজপুরে। থাকার জায়গার অভাবে কয়েক বছর ধরে তিনি স্টেশনেই ঘুমান। ‘ভিক্ষা করতে শরম লাগে’: অশীতিপর খলিল হোসেনের জীবনের গল্প অন্যরকম। স্ত্রী মারা গেছেন অনেকদিন। থাকার মত একটি ঠিকানা থাকলেও ছেলে এবং ছেলেবউয়েরা চায় না বলে তাকেও আশ্রয় নিতে হয়েছে স্টেশনে। বয়সের ভারে এখন আর কোনও কাজ করতে পারেন না খলিল মিয়া। আবার ভিক্ষা করে খেতেও লজ্জা লাগে। তিনি বলছেন ছেলে মেয়েরা বাসা নিয়া থাকে। বড় বউ কয় খাইয়া যাইও, থাকনের জায়গা নাই। আজান দিলে গিয়া নামাজ পড়ে আসি। রাইতে এইখানে থাকি। পোলাপাইনের বাসায় মাঝেমধ্যে খাইয়া আসি, হেরা মাঝেমধ্যে টাকাপয়সা দিলে হোটেলে খাই। অনেকসময় হোটেলের লোকেরা কয় আইসা খাইয়া যাইয়েন, টেকা লাগবো না। আমি শরম লজ্জায় যাই না। ভিক্ষা করতেও লজ্জা লাগে: বয়সের কারণে প্রায় সবগুলো দাঁতই পড়ে গেছে। কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে যায় তার। তবুও কাউকে নিজের দু:খের কথা বলার সুযোগ পেয়ে যেন থামতেই চাইছিলেন না আশ্রয়হীন এই বৃদ্ধ। তবু তাকে পেছনে রেখে চলে আসতে হয়। ফুটপাতের রাত: রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বাস স্ট্যান্ড শুধু নয়। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোলা আকাশের নিচে দেখা যায় পথবাসী বহু মানুষকে। এর মধ্যে অন্যতম কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, গ্রীনরোড, মৌচাক, গুলিস্তান এলাকার বিভিন্ন ফুটপাথসহ বিভিন্ন জায়গা। কারওয়ান বাজার সংলগ্ন রাস্তার ওপর দিয়ে একটার পর একটা গাড় হর্ন বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু প্রচন্ড এই শব্দও ঘুমে একটুও ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে না পথবাসী মানুষদের। কেউ পলিথিন বিছিয়ে কেউ কেউ খবরের কাগজ বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কারও মাথার নিচে বালিশের মত করে দিয়েছেন এক টুকরো ইট বা কাপড়। কিন্তু এরইমধ্যে বৃষ্টি নেমে এসেছে। বৃষ্টির মাঝে কিভাবে ঘুমান মাথার ওপর ছাদহীন এইসব মানুষেরা? ২৬ বছর পথের পাশে: ২৬ বছর ধরে ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন এমন এক দম্পতিকে ঘুমতে দেখা গেল কারওয়ান বাজারের ঠিক উল্টোদিকের ফুটপাতে। তারা বলছেন “যখন বৃষ্টি নামে তখন বিছনা উঠাইয়া পাশের দোকানের সামনে বসি, বৃষ্টি থামলে আবার শুই। কি করুম”। একজন মহিলা হিসেবে রাতে পথে থাকতে ভয় লাগে কি-না জানতে চাইলে এই ছাব্বিশ বছর ধরে রাস্তায় রাত কাটানো এই নারী বলেন, “অহন আর ভয় কি? আমরার কি অইব? আমাদের কাছ থেইকা কি টেহা-পয়সা নিতে পারবো? এই দম্পতির ছেলেমেয়েরা থাকে গ্রামে। আর তারা রোজগার করে ভিক্ষা করে। পথে পথে বেড়ে ওঠা: রাস্তার ঠিক উল্টো পাশেই বহুতল ভবনের নিচে পলিথিনের ছাদ দিয়ে অস্থায়ি ঘর বানিয়ে মাকে নিয়ে ঘুমানোর আয়োজন করেছে শেফালি। পাশেই আরো কয়েকজন মহিলাকে দেখা গেল। ছয়বছর বয়স থেকে ফুটপাথে থাকে শেফালি। সে বলে, “আমার মা আছে মাথায় একটু ডিফেক্ট, তারে নিয়া আমি থাকি। ভাই আছে দুইটা। বড় ভাই গাড়ি চালায় আর ছোট ভাই ভ্যান চালায়। তাগো সাথে মিল নাই”। সারাদিন এখানে ওখানে খেটে কিছু টাকা পয়সা রোজগার করলেও অনেক সময় ঘুমের মাঝে চুরি করে নিয়ে যায় কেউ। সে বলে “রাত দশটা বাজলে সব অফিস থেকে যখন লোকজন চলে যায় তখন তারা পলিথিন দিয়ে এই অস্থায়ি ঘর বানায়। আবার অফিসের লোকজন চলে আসার আগেই সকাল সকাল খুলে ফেলি”। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতে হয় তাদের। গোসল এবং প্রাত্যহিক বিভিন্ন কাজকর্ম সম্পাদন করতে হয় টাকার বিনিময়ে। জীবিকার খোঁজে ঢাকায়: এরকম আরো অনকেই আছেন যারা মূলত নদীভাঙন, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতি বিপর্যয়ের পরে ঘরহীন হয়ে পথকে আশ্রয় করে। আবার অনেকে পথে নামে পরিবারের ভাঙনের কারণে। এমনটাই বলছিলেন সাজিদা ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কমকর্তা এরশাদ আলী। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সাল থেকে পথবাসী মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। আলী জানান, “সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বর্তমানে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা শুধু ঢাকাতেই ২৫ থেকে ৩০ হাজার। বিভিন্ন কারণে বাধ্য হয়ে তারা শহরে আসে এবং যেসব জায়গায় তারা জীবিকা খূঁজে পায় সেসব এলাকার পথকে তারা বেছে নেয়। এরকমও অনেকে আছে ৩০-৩৫ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় আছে। রাস্তায় বিয়ে হয়েছে, ছেলে মেয়ে হয়েছে এমনও আছে”। সমপ্রতি পরিসংখ্যান ব্যুরো একটি জরিপ করেছে। তবে এর ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি। রাতের অন্ধকার এখন আর ভীত করে না তাদের: আলী জানান, আমরাও মানুষ নামে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে মোট এগারো হাজার পথবাসী মানুষকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুরুর দিকে এই শ্রেণীর মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা সহজ ছিল না বলে তিনি জানান। “প্রথম দিকে তাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে তারা সঠিক তথ্য দিতে চাইত না। কিংবা ডে কেয়ার সেন্টারগুলোতে শিশুদের রাখতে চাইতো না। তারা ভয় পেত হয়তো শিশুদের পাচার করা হবে। তবে এখন অবস্থা অনেক বদলেছে”। এইসব মানুষদের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ রয়েছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের। গত অর্থবছর থেকে ডিসিসির বাজেটে পথবাষীদরে উন্নয় কাজের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ডিসিসির দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বস্তি উন্নয়ন বিভাগের গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসদুজ্জামান জানান, “কয়েকটি এলাকায় এদের আবাসনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫টি পথবাসী কেন্দ্র নির্মানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য ঢাকার ধলপুরে পথবাসীদের জন্য দুই কাঠা জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং নির্মাণ কাজ চলছে। সেখানে মতিঝিল থেকে শুরু করে কমলাপুর, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী এই এলাকার দুই হাজারের মত পথবাসীকে সেবা দেয়া যাবে। এছাড়া কেন্দ্র নির্মানের জন্য আরও দুটো জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে”। পথবাসীদের জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট দিতে ডিসিসির সবগুলো আঞ্চলিক দপ্তর কাজ করছে। এর মাধ্যমে তারা জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করতে পারছে। ফলে ভোটও দিতে পারেন এই শ্রেণীর মানুষেরা। তাদের স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়। পথবাসী শিশুদের স্বপ্ন: পথবাসী বাবা মায়েরা নিজেদের মাথা গোজার জন্য নিরাপদ আবাসের ব্যবস্থা করতে না পারলেও সচেতন হচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে। সাজিদা ফাউন্ডেশনের যেসব কেন্দ্রগুলে রয়েছে সেখানে দেখা গেল অনেক পথবাসী বাবা-মা সন্তানদের দিবাযত্ন এবং রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করেছেন। এরকম একটি দিবাযত্ন কেন্দ্রের শিশুদের সাথে আলাপ হচ্ছিল। শিশুরা যেহেতু ভনিতা করতে পারে না। তাই ছোট ছোট শিশুদের কেউ কেউ হয়তো বলেই ফেলে যে রাস্তায় রাস্তায় থাকতে তাদের বেশ ভালই লাগে। তবে যারা একটু বুঝতে শিখেছে তারা বলছে, খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চিত এই জীবন তারা চায় না। অন্য সব শিশুদের মত তারাও চায় বাবা-মায়ের সাথে নিরাপদ নিশ্চিন্ত আবাস। এই শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা মনে করেন, এদের পুনর্বাসনে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে আরো উদ্যোগ দরকার। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে এইসব মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করতে পারলে সংখ্যাটি ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে মনে করেন তারা। এইসব পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্যরাও এখন এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সুত্র:- সংগ্রহ

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *