ফুরিয়ে আসছে সংবাদপত্রের দিন

0045 (3)প্রথম সকাল ডেস্ক: সেই ১৪৫০ সালের কথা। জার্মানির নাগরিক গুটেনবার্গ উদ্ভাবন করেন মুদ্রণযন্ত্র। পেশায় তিনি ছিলেন কামার। হাতুড়ি পেটানো সেই মানুষটির তৈরি মুদ্র্রণযন্ত্র যোগাযোগ-বিশ্বে বিপ্লব বয়ে আনে। সেই বিপ্লবের হাত ধরে জন্ম নেয় সংবাদপত্র। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই সংবাদপত্র অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গণতান্ত্রিক বিশ্বের চতুর্থ স্তম্ভের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ২০ শতকের শেষ ভাগে এসে প্রকাশনায় কম্পিউটার যুক্ত হওয়ায় গণমাধ্যম হিসেবে চূড়ান্ত রূপ পায় সংবাদপত্র। মুদ্রণপ্রযুক্তি, কাগজ ও কালির ক্রম আধুনিকায়নের ফলে রঙে-ঢঙে বিবর্তিত হয়েছে সংবাদের এই মাধ্যম। কিন্তু ২০ শতকের শেষভাগেই আবার সংবাদপত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ইন্টারনেট-ভিত্তিক সীমাহীন ভার্চুয়াল বিশ্ব। অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো এবং সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইট হরদম সংবাদের জোগান দিচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ইন্টারনেটের দুনিয়ায় মানুষ কি আর কাগজে ল্যাপটানো কালির অক্ষরের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বোলাচ্ছেন, নাকি বিকল্প কোনো মাধ্যমে খবরের ক্ষুধা মিটিয়ে নিচ্ছেন? সম্প্রতি বিশ্বের গণমাধ্যম-তাত্ত্বিকরা সংবাদপত্রের জন্য দুর্দিনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। তাদের পূর্বাভাসের মূল প্রেরণা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশ এবং এর বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠা। ‘আজকের খবর কালকে পড়ার’ অভ্যাসের পরিবর্তে অনলাইন সংবাদমাধ্যম  দিচ্ছে ‘মুহূর্তের খবর মুহূর্তে পড়ার’ সুযোগ। ফলে কেউ চাইলে প্রতি মুহূর্তের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছেন মুঠোফোনের মতো যোগাযোগের একটি খুদে মাধ্যম দিয়ে। যার কারণে সংবাদপত্রের চেয়ে বিকল্প মাধ্যমেই খবর পাওয়া এখন অনেক সহজ হয়েছে। তবে সংবাদপত্রের বিকল্প মাধ্যম বলতে টেলিভিশন, রেডিওকে দাঁড় করানোর কোনো যুক্তি নেই। কারণ এই তিনটি মাধ্যম অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে টিকে আছে। কখনো সংবাদপত্রের খবর হচ্ছে টেলিভিশন, আবার সংবাদপত্র কখনো টেলিভিশনের খবর হচ্ছে। রেডিওর বেলায়ও তা-ই। এই তিনটি মাধ্যম পরস্পর পরস্পরকে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে যার যার স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে সংবাদপত্রের অস্তিত্বের জন্য রেডিও-টেলিভিশন কখনো চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। সাংবাদিকতার ছাত্র হিসেবে এ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাপত্র পড়ার সুযোগ হয়েছে। দেখা গেছে, রেডিও-টেলিভিশন আবিষ্কারের পর ‘সংবাদপত্র’ হুমকিতে পড়ছে বলে যে আওয়াজ ওঠে, তা বাস্তবতার নিরিখে প্রমাণিত হয়নি। ইন্টারনেটের কল্যাণে সংবাদপত্রের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে অবির্ভূত হয়ে দ্রুত বিকাশ লাভ করছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, যাকে বলা হচ্ছে অনলাইন-ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল। এই নিউজ পোর্টালগুলো অল্প সময়েই সংবাদের ‘বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম শৈশব ছেড়ে কেবল কৈশোরে পা দিচ্ছে; যৌবনে পা রাখতে আরো সময় লাগবে। তখন সংবাদপত্র কি মানুষের সংবাদ-আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে, নাকি নিউজ পোর্টালগুলো সংবাদ জোগানের ‘বিকল্প’ থেকে ‘মূলধারা’ হয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হতে পারে। তবে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের অগ্রযাত্রায় সংবাদপত্রের ভিত্তি যে নড়ে উঠেছে, তা সহজেই বলা যায়। বিশ্বের নামীদামি পত্রিকাগুলো তাদের প্রচারসংখ্যা ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের পাঠকসংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিপরীতে নিউজ পোর্টালের পাঠকসংখ্যা বেড়েই চলেছে। যে কারণে শুধু মুদ্রণ ভার্সনে ভরসা রাখতে পারছেন না সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষ-মালিকেরা। ফলে কাগজের পাশাপাশি ‘ই-পত্রিকা’ হিসেবে অনলাইনেও প্রকাশিত হচ্ছে এসব সংবাদপত্র। একই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি পত্রিকাই একই নামে অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, ইনডিপেনডেন্ট- তিনটি পত্রিকারই একই নামে অনলাইন ভার্সন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, তাদের অনলাইন পাঠকসংখ্যা পত্রিকার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে বলা যায়, মুদ্রণযন্ত্রের পরে সংবাদমাধ্যম অর্থাৎ গণমাধ্যমের দ্বিতীয় বিপ্লব এনেছে ইন্টারনেট। কারণ এখন ‘সংবাদের জন্য পাঠকরা অপেক্ষা করেন না, পাঠকদের জন্য সংবাদ অপেক্ষা করে।’ আর এ সম্ভব হয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণেই। আমরা দেখছি, যুগের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিশ্বের শতাব্দীপ্রাচীন ও বড় পত্রিকাগুলো অনলাইন সংবাদমাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় ‘লিয়োড’স লিস্ট’-এর কথা। ১৭৩৪ সালে লন্ডনে পত্রিকাটি যাত্রা শুরু করে।  একটানা ২৮০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছিল এটি। কিন্তু সম্প্রতি এর মুদ্রণ ভার্সন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পত্রিকাটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সংবাদমাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। অনলাইনে তাদের পাঠকসংখ্যাও বেশ ভালো। লিয়োড’স লিস্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটিকে সংবাদপত্রের জন্য অশনিসংকেতই বলতে হবে। এখন থেকে পাঁচ বছর আগে ‘সিয়েটল পোস্ট-ইন্টেলিজেন্সার’-এর ছাপাখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি এখন অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। ‘ক্রিস্টিয়ান সায়েন্স মনিটর’ তাদের কাগুজে সংস্করণ বন্ধ করে দিয়ে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘নিউজ উইক’, ‘ইউএস নিউজ’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট’-এর মতো জনপ্রিয় সাময়িকীগুলো তাদের প্রিন্ট এডিশন বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই ভেসে আসে তাদের অনলাইন ভার্সন। সত্যিই বিস্মিত হতে হয়, যুগের হাওয়া বদলের এই নির্মম বাস্তবতা দেখে! গণতান্ত্রিক বিশ্বে সংবাদপত্রের বলিষ্ঠ উপস্থিতি লক্ষ করা যায় ২০ শতক জুড়ে। এ শতকে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সংবাদপত্র সমহীমায় উদ্ভাসিত হয়। অর্থ ও ক্ষমতার দিক থেকে রাষ্ট্র ও সমাজে অধিপত্য বিস্তার করেন সাংবাদিক ও পত্রিকার কর্তৃপক্ষ-মালিকেরা। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে এ গণমাধ্যম। কিন্তু ২০ শতকের শেষভাগে এসে খবরের কাগজের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম। ভার্চুয়াল জগতের বিস্ময়কর বিস্ফোরণের ফলে সংবাদপত্র প্রথমেই মার খেতে শুরু করে বিজ্ঞাপনের দিক থেকে। অনলাইন-ভিত্তিক অসংখ্য বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানে চলে আসতে থাকে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন, যার একটি বড় অংশ বিজ্ঞাপিত হতে শুরু করে নিউজ পোর্টালগুলোতে। যেহেতু সংবাদপত্রের বা যেকোনো সংবাদমাধ্যমের জন্য একমাত্র বৈধ আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন, সেহেতু বিজ্ঞাপন-খরায় পড়ে অনেক পত্রিকা তাদের কলেবর গুটিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সংবাদপত্রের জন্য বিজ্ঞাপন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার সাক্ষ্য মেলে ‘মিডিয়া মোগল’ খ্যাত যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সাংবাদিক ও সংবাদপত্র-মালিক রুপার্ট মার্ডকের কথায়। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্র হলো সোনা-প্রবাহিত নদীর মতো।’ বিজ্ঞাপন থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেছিলেন, সে বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি এ কথা বলেন। কিন্তু এর কয়েক বছর পর বড্ড হতাশা নিয়ে বলেন, ‘হয়তো কিছু দিনের মধ্যে সোনা-প্রবাহিত নদী শুকিয়ে যাবে।’ ভার্চুয়াল জগতের সম্প্রসারণের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইউরোপের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বাফেলো নিউজ’-এর মালিক ওয়ারেন বাফেট সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন ‘ক্যাবল ও স্যাটেলাইট সম্প্রচার মাধ্যম এবং সেই সঙ্গে ইন্টারনেট প্রযুক্তি যদি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সংবাদপত্রকে হয়তো আমরা আজকের অবস্থায় দেখব না। ২১ শতকের প্রথম দশকে ইউরোপের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র এবং মিডিয়া গ্রুপগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। যে কারণে তারা কর্মী ছাঁটাইয়ে বাধ্য হয়। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যের দ্য ইনডিপেনডেনন্ট, লন্ডন ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড, এ দুটি পত্রিকার আয় ২৪ শতাংশ কমে যায়। ফলে এর আংশিক মালিকানা বিক্রি করে দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে লোকসানের মুখে পড়ে যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড ‘ডেইলি মেইল’ কর্মী ছাঁটাইয়ে বাধ্য হয়। লেইসেসটার মারকারি, ব্রিস্টল ইভিনিং পোস্ট, ডারবি টেলিগ্রাফ- প্রতিটি পত্রিকাই বড় অংশে কর্মী ছাঁটাই করে। বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমে যাওয়ায় তারা এ পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। কিন্তু মজার ব্যাপর হলো, এসব পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের পাঠকসংখ্যা প্রিন্ট এডিশনের চেয়ে অনেক বেশি। অনলাইনে বিজ্ঞাপনও ভালো। ফলে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা যত বাড়ছে, কাগজে ছাপানো পত্রিকার বাজার ততই ছোট হয়ে আসছে। এখানে আরেকটি প্রসঙ্গ বলে রাখা প্রয়োজন। যেসব মানুষের বক্তব্য বা মতামত নেওয়ার জন্য সাংবাদিকরা দিনের পর দিন তাদের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন, তারাই যদি তাদের কথা সবাইকে বলে দেন, তাহলে সংবাদপত্র কিনে পড়ার প্রয়োজন পড়ে কি? উদারহণ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথাই বলা যায়। তিনি নিয়মিত ফেসবুক, টুইটারে তার বক্তব্য পেশ করছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামত জানিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ তার বন্ধু তালিকায় রয়েছেন এবং মুহূর্তেই তারা প্রেসিডেন্টের বক্তব্য জানতে পারছেন। ফলে এক দিন পরে পত্রিকায় এসব বিষয় নিয়ে খবর প্রচারিত হলে তা ‘বাসি খবর’ বলে বিবেচিত হয়। এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নেওয়া জরুরি। সংবাদপত্রের বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে কয়েক শ বছর আগে। এখন অনলাইন সংবাদমাধ্যমের এক ফুৎকারে পত্রিকা হাওয়া হয়ে যাবে, তা বলার চেষ্টা করারও বোকামি। কারণ সংবাদপত্রকেন্দ্রিক অসংখ্য সহায়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কয়েক ধরনের শিল্প, যেমন- কাগজ, কালি, মুদ্রণযন্ত্রাংশ অনেকখানি সংবাদপত্রনির্ভর। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণেও সংবাদপত্র আরো কয়েক বছর হয়তো টিকে থাকবে। তারপর কী হবে, সে কথা বলা ভবিষ্যৎকে হাতে তুলে নেওয়ার মতো গুরু অপরাধ হয়ে যাবে। তবে এ কথা বলা যায়, সংবাদপত্র জাদুঘরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। পৌঁছতে যত দেরি, এই আর কি! আর সংবাদপত্র যদি বহু বছর টিকেও থাকে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে বিষয়টি দাঁড়াবে ‘বিমান ছেড়ে বাইসাইকেলে যাত্রা’র মতো। সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সাংবাদিক ও মিডিয়া-গবেষক এরিক বিচার ২০১৩ সালের জুলাইয়ে ‘দি ডেথ অব ফেয়ারফ্যাক্স অ্যান্ড এন্ড অব নিউজপেপার’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এতে তিনি খবরের কাগজের অদূর সোনালি অতীত এবং ২০০০ সালের পর থেকে এর অবনমন নিয়ে চাক্ষুষ তথ্য-প্রমাণ হাজির করেছেন। এরিক বিচার তার লেখায় বিশ্বের অন্যতম সংবাদ সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্স এবং এর দ্বারা পরিচালিত তিনটি পত্রিকার মুমূর্ষু অবস্থা তুলে ধরেছেন। দ্য এজ, সিডনি মর্নিং হেরাল্ড এবং দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ পত্রিকা তিনটি বন্ধের পথে। দ্য এজ ও সিডনি মর্নিং এরই মধ্যে ট্যাবলয়েডে রূপান্তরিত হয়েছে। ফেয়ারফ্যাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্রেগ হেউড মনে করেন, অল্প কয়েক বছরের মধ্যে পত্রিকার বাজার ডিজিটালে রূপান্তরিত হবে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ছোট পরিসরে হলেও সারাক্ষণ তথ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক, টুইটারের মতো বিশ্ববিস্তৃত সামাজিক যোগাযোগের সাইট ও মাইক্রো ব্লগিং সাইটগুলো। পরিসরে ছোট হলেও ব্লগগুলো এখন জনপ্রিয় যোগাযোগের মাধ্যম। এতে তথ্যের প্রবাহ যেমন আছে, তেমনি আছে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ। এগুলো সাংবাদিকতার ছোট ছোট জগৎ বললে খুব অন্যায় হবে না। সংবাদপত্রের বিকল্প হিসেবে ইন্টারনেট-ভিত্তিক আরেকটি মাধ্যম বিকশিত হচ্ছে। তা হলো নেট টিভি। লিখিত খবরের পাশাপাশি যেকোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ভিডিওচিত্র এতে পাওয়া যায়। টেলিভিশনের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হলো- টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভিডিও পাঠক-দর্শকরা যেকোনো সময় ইচ্ছা করলেই দেখতে পারেন না, কিন্তু নেট টিভিতে সেই সুযোগ আছে। ভিডিও শেয়ারের সামাজিক যোগাযোগের সাইট ইউটিউবের মতো খানিকটা। নেট টিভি সুপরিকল্পিত ভিডিও-টেক্সট অনলাইন সংবাদমাধ্যম। আর ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ভালো লাগা-না-লাগার ওপর নির্ভরশীল ইউটিউব। নেট টিভির আধেয় পাঠক-দর্শকরা নিজের প্রয়োজনে সংরক্ষণ করতে পারেন, যে সুবিধা টেলিভিশনে নেই; থাকলেও তা জটিলতায় পূর্ণ। সংবাদপত্রের সুবিধা হলো তা সহজে সংরক্ষণ করা যায়। তবে বান্ডিল বান্ডিল সংবাদপত্রের পরিবর্তে সব খবর যদি একটি খুদে ইলেট্রনিক ডিভাইসে পাওয়া যায় এবং তা সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে নিশ্চয়ই তা উত্তম উপায়। এদিকে ঝুঁকছেন বিশ্বের মানুষ। আর এ কারণে বলা শুরু হয়েছে, ফুরিয়ে আসছে সংবাদপত্রের দিন। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন- সবই এখন ইন্টারনেটমুখী। চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে টেন্ডার- সবই পাওয়া যায় ইন্টারনেটে, বিনা পয়সায়। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এবং উঠছে বড় বড় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। সংবাদপত্রের বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠার প্রতি এগুলো চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না পত্রিকাগুলো। এক দশক আগেও বিজ্ঞাপন থেকে অস্ট্রেলিয়ার দ্য এজ এবং সিডনি মর্নিং হেরাল্ড যৌথভাবে বছরে ২০ কোটি মার্কিন ডলার লাভ করত। কিন্তু ২০১৩-২০১৪ সালে এসে লাভের অঙ্ক শূনের কাছাকাছি ঠেকেছে। আয়-ব্যয় প্রায় সমান। আগে যেখানে প্রতিটি পত্রিকা সপ্তাহে ২০০ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন ছাপত, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ পৃষ্ঠায়। এসব পত্রিকা মালিক-প্রকাশকের কাছে শুভংকরের ফাঁকি হয়ে উঠেছে। ব্রান্ড ভ্যালু ছাড়া এগুলোর আয়-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। খবরের কাগজের সময় যে ফুরিয়ে আসছে, তার পূর্বাভাস পাওয়া যায় ‘বিশ্বগ্রাম’ ধারণার প্রবক্তা মার্শাল ম্যাকলুহানের মুখে। তিনি বলেছিলেন, শ্রেণিভুক্ত বিজ্ঞাপন (এবং শেয়ারমার্কেট-বৃত্তান্ত) সংবাদপত্রের ভিত্তি। যদি কোনো বিকল্প মাধ্যমের সৃষ্টি হয়, যেখান থেকে এসব (বিজ্ঞাপন) পাওয়া যাবে, তাহলে সংবাদপত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। ম্যাকলুহানের এ কথার অর্থ আজকের দুনিয়ার সংবাদপত্র-মালিক-কর্তৃপক্ষ নিঃসন্দেহে সবার চেয়ে ভালো অনুভব করছেন নিশ্চয়! কানাডার ‘পাওয়ার করপোরেশন’ নামক প্রতিষ্ঠান-পরিচালিত লা প্রেস পত্রিকাটি বন্ধ করার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। এটি ডিজিটাল ট্যাবলয়েডে রূপান্তরিত হয়েছে। এরপর এক দিনের হিসাব থেকে দেখা যায়, এর বিভিন্ন কনটেন্ট (সংবাদ ও অন্যান্য) ৪ লাখ ৯০ হাজার বার ডাউনলোড করেছেন পাঠক। এ হিসাব অনলাইন সংবাদমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেয়। ৫ জুলাইয়ে টেলিগ্রাফের একটি খবরে দেখা গেল, গার্ডিয়ান পত্রিকা তাদের মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য গভীর চিন্তাভাবনা করছে। এরই মধ্যে তারা বিশাল পরিসরে অনলাইন সংস্করণ চালু করে দিয়েছে। দ্য সান, পকার প্লেয়ার এবং দ্য অনিয়ন তো আগেই অনলাইন সংস্করণে চলে গেছে। তাদের অনলাইন পাঠকসংখ্যা কাগজের চেয়ে অনেক বেশি। ভারতেও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জয়জয়কার অবস্থা। এ বছরের জানুয়ারিতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী ও ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানি গণমাধ্যমে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। তাদের অধিকাংশ বিনিয়োগ হয়েছে অনলাইন-ভিত্তিক সংবাদ ও বিনোদন মাধ্যমে (নেটওয়ার্ক ১৮ মিডিয়া অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট) ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই এসব তথ্যের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। সুতরাং, উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ফুরিয়ে আসছে সংবাদপত্রের দিন। এখন সময় অনলাইনের। তথ্য সুত্র: সংগৃহীত

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *