খেজুর গাছে অপার সম্ভাবনা

প্রথম সকাল ডেস্ক: প্রতি বছর নির্দিষ্ট কিছু দিনে ‘বৃক্ষ-নিধন বন্ধ করুন, গাছ লাগান ও পরিচর্যা করুন’ এমন স্লোগান শোনা যায়। ঘেষণা দিয়ে হয়তো কিছু গাছও রোপণ করা হয়। অথচ কৃষি প্রধান এ দেশে খেজুর গাছও যে আর্থিকভাবে সম্ভাবনাময় হতে পারে এমনটা আমরা কখনও ভেবে দেখি নি। নানা রকম ঔষধি এবং ফলের গাছ রোপণ করা হলেও নিখরচায় তেমন কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠা খেজুর গাছ আজও অবহেলিতই রয়ে গেছে। অথচ উত্তরাঞ্চলে ৭ কোটি খেজুর গাছ লাগিয়ে ৫০ হাজার কুইন্টাল পাটালি গুড় উৎপাদন সম্ভব। কষ্ট সহিঞ্চু খেজুর গাছ যে কোনো পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। এ গাছে কাঁটা থাকায় চারা অবস্থায় গরু-ছাগলও খায় না। ফলে বাড়তি তেমন সতকর্তার প্রয়োজন পড়ে না। খেজুর গাছ সৌন্দর্যবর্ধক। শহর কিংবা গ্রাম দুই জায়গাতেই এ গাছ রোপণের মতো পরিবেশ রয়েছে। শহরে পার্ক বা বড় কোনো স্থাপনার সীমানায়, স্কুল-কলেজের পাশে, সড়ক পথের দুই ধারে; গ্রামাঞ্চলে ক্ষেতের আইলে, রাস্তার পাশে, বাড়ি বা মাঠের কোণায় এমনকি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রেললাইন এবং পুকুর পাড়েও খেজুর গাছ রোপণ করা যেতে পারে। দেশে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। বিশেষ করে পুরুষ খেজুর গাছে রস কম হয় বলে সেগুলো কেটে ইটের ভাটাতে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়াও মৌসুমের সময় খেজুর গাছ ছাঁটাইকালে অদক্ষতার কারণে বেশি রসের আশায় কাণ্ডের শেষ প্রান্ত চেঁছে গর্ত করে ফেলায় অনেক গাছ অকালে নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে গ্রামাঞ্চলে অনেক খেজুর গাছ থেকে পরে আর আশানুরূপ রস সংগ্রহ করা যায় না। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করলে উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহে প্রায় ৭ কোটি খেজুর গাছ রোপণের মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কুইন্টাল পাটালি গুড় উৎপাদন সম্ভব বলে পাবনা জেলার সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। একটি খেজুর গাছ থেকে বছরে যে ২-৩ কুইন্টাল রস পাওয়া যায় তা থেকে অনায়াসে ১৫-২০ কেজি পাটালি গুড় উৎপাদন সম্ভব। উত্তরাঞ্চলে আখ চাষের পাশাপাশি অধিক হারে খেজুর গাছ চাষ করলে আখের গুড়ের ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া যাবে। একইসঙ্গে খেজুরের রস দিয়ে চিনি উৎপাদন করা সহজতর হয় কিনা এ বিষয়েও  গবেষণা প্রয়োজন। অর্থকরী উদ্ভিদ হিসেবে খেজুর গাছের গুরুত্ব রয়েছে। এ গাছের মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। খেজুর গাছের জমিতে আলাদাভাবে সেচ বা পরিচর্যার দরকার হয় না। এ ধরনের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেকে গাছ কেটে ইটের ভাটায় বিক্রি করছেন। খেজুর চাষিদের অনেকেই আবার অধিক রস উৎপাদনের ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। এ সমস্যা সমাধানে স্বল্প মেয়াদে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রস উৎপাদন কৌশল, রস সংরক্ষণ ও পাটালি গুড় তৈরির বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম কৃষকদের অবগত করা দরকার ১৯৮১ সালের এক সরকারি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় ৩৯৩ হেক্টর জমিতে খেজুর গাছ চাষ হচ্ছে। এখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার ৩৪৫ মণ রস উৎপাদন হয়। এর পরেই রয়েছে বৃহত্তর বগুড়া জেলার স্থান। এ জেলার প্রায় ১৫৮ হেক্টর জমি থেকে রস পাওয়া যায় ৬ হাজার ৪৯ মণ। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাবনা জেলা। পাবনার ৮১ হেক্টর জমিতে যে পরিমাণ খেজুর গাছ রয়েছে সেগুলো থেকে ৪ হাজার ৬১১ মণ রস উৎপাদন হয়। বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরে যথাক্রমে ৫৭ ও ৫৩ হেক্টর জমিতে খেজুর চাষ হচ্ছে। রসের পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ মণ এবং ২ হাজার ১২৫ মণ। সংশ্লিষ্ট জেলার চাষিরা বলছেন, উৎপাদনের পরিমাণ তিনগুণ করা সম্ভব হবে কৃষি বিভাগের সহায়তা পেলে। গ্রাম বনায়ন কর্মসূচির সঙ্গে খেজুর গাছের চারা বিতরণ কর্মসূচি আজও শুরু হয় নি। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ বৃক্ষরোপণ উৎসবে সাধারণত ঔষধি, ফলজ এবং জ্বালানি কাঠ-এই তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে জনসাধারণকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করে। কিন্তু এই গাছগুলোর মধ্যে খেজুর গাছ অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি। অথচ উত্তরাঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধগুলোর পাশে খেজুর গাছ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। খেজুর গাছ চাষে কোনো খরচ লাগে না। বিস্তৃর্ণ জমিরও প্রয়োজন হয় না। এ জন্য চাই কেবল সদিচ্ছা। এ ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পুরুষ খেজুর গাছ থেকে রস কম হলেও সেই রসে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। তাছাড়া পুরুষ খেজুর গাছ কাটার আগে বুঝতে হবে, পুরুষ গাছ না থাকলে অন্যান্য স্ত্রী গাছের পরাগ সংযোগ ঠিকমত হয় না। এ কারণে ফলনও কম হয়। এ ছাড়াও রস সংগ্রাহকদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে গাছের কাণ্ডের শেষ প্রান্ত ছাটাই কাজে দক্ষ করে তোলা দরকার। তা না হলে গাছের বেশ ক্ষতি হয়। এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত যাতে খেজুর গাছ রোপণে বৃক্ষচাষীরা উৎসাহিত হন এবং খেজুর চাষ করে তারা লাভবান হতে পারেন।

This website uses cookies.