লাখো মানুষের দিন বদলে একটি রাস্তা

প্রথম সকাল ডেস্ক: একটি মহাসড়ক দিন বদলে দিয়েছে চলনবিল অঞ্চলের লাখো মানুষের। এটি হচ্ছে, সিরাজগঞ্জ হাটিকুমরুল-নাটোর বনপাড়া মহাসড়ক। শুধুমাত্র একটি সড়ক আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছে চলনবিলের অবহেলিত শত শত গ্রাম জনপদে। এ অঞ্চলে শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য, আর্থ-সামাজিক অভাবনীয় উন্নয়ন ও আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে এই সড়ক, যা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলা নিয়ে চলনবিল অঞ্চল গঠিত। সড়কটি নির্মাণের ফলে ৬টি উপজেলার লাখ লাখ মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৯১৪ সালে চলনবিলের বুক চিরে রেল লাইন তৈরি করেছিল। সেটাই ছিল তৎকালীন সময়ের একমাত্র যোগাযোগের পথ। ভাঙ্গুড়া-চাটমোহর, বড়ালব্রিজ-মোহনপুর-সহ অনেক ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের এই রেলপথ ছিল যাতায়তের একমাত্র রাস্তা। প্রচলিত আছে, এক সময় এ অঞ্চলের মানুষদের জেলা শহরে যাতায়াত করতে দু’দিন সময় লাগতো। কাঁদা-পানি ভেঙ্গে, গরুরগাড়ী চড়ে আসতে হতো তাদের। বৃটিশ সরকার এই অঞ্চলের মানুষের কথা ভেবে রেললাইন তৈরি করে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার মহাসড়কটি তৈরির উদ্যোগ নেয়। তৃতীয় সড়ক পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পাধীন নলকা হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক (২৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৮) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। সড়কটি নির্মাণের ফলে রাজশাহীর সাথে সিরাজগঞ্জের মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যায়। সড়কটি নাটোরের বনপাড়া হয়ে সিংড়া, গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া উপজেলা ও পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া উপজেলা ছুঁয়ে চলনবিলের বুক চিরে সলঙ্গা হার্টিকুমরুল মোড়ে নগরবাড়ি, বগুড়া ও ঢাকা মহাসড়কে এসে মিলিত হয়েছে। মহাসড়কটি নির্মিত হওয়ায় আজ চলনবিল অঞ্চলের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার সর্ম্পক তৈরি হচ্ছে। শস্য ও মৎস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ মাছ ও ধান এক সময় দেশের কোথাও সরবরাহ করা যেত না। এতে করে এ এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবি সম্প্রদায় উৎপাদিত ফসল ও মাছের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হত। এখন আর সেইদিন নেই। সড়কটির মহিষলুটি, মান্নান নগর, দবিরগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মৎস্য আড়ত হয়েছে। এ সকল আড়ত থেকে ঢাকা, পাবনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জের মৎস্য ব্যবসায়ীরা মাছ নিয়ে হাট-বাজারে সরবরাহ করছে। শুধুমাত্র মৎস্য চাষ করেই বছরে শত শত কোটি টাকা আয় করছে। অনুরুপভাবে ধান, পাট, গম, শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফসল সরবরাহের মাধ্যমে একদিকে যেমন আশেপাশের কয়েকটি জেলার চাহিদা পূরণ হচ্ছে অপরদিকে এখানকার কৃষকেরা পাচ্ছে ন্যায্যমূল্য। এতে করে এ এলাকার কৃষক, শ্রমিক দিনমজুরদের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বিগত প্রায় ১৬ বছরে এই মহাসড়ককে ঘিরে ছোট ছোট অসংখ্য পাকা সড়ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায়ের সংযোগ সড়কও পাকা হয়েছে। এই মহাসড়ক তৈরী হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। লেখাপড়ার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড়ে উঠেছে শত শত সরকারী ও বেসরকারী স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা। তাছাড়াও ছেলে মেয়েরা এখন ঢাকা-পাবনা নাটোর রাজশাহী-সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করছে। সিরাজগঞ্জ পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজ এর প্রভাষক তাড়াশ উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা আবু সামা তার ছাত্র জীবনের কষ্টকর স্মৃতির কথা উল্লে¬খ করে বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে হয়ে শুধু ঢাকা যেতেই আমাদের দুই দিন সময় লেগেছে।  আর এখন একদিনেই ঢাকায় গিয়ে  ঘুরে আসা যায়। চলনবিলের মানুষেরা এখন নিজেদের দিন বদলে শুধু সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তাড়াশের নওঁগা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ জানান, বর্ষা মৌসুমে কখনোবা নৌকায়, কখনোবা কাঁদা-পানি মাড়িয়ে ১৮ কিলোমিটার পথ বহুকষ্টে পাড়ি দিয়ে লাহিড়ী মোহনপুর থেকে ট্রেনে চরে সিরাজগঞ্জ শহরে যেতে হত। তিনি জানান, এমন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকায় কোন বন্ধু পর্যন্ত বেড়াতে আসতো না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সাথে এখন দেশ বিদেশের পর্যটক এবং বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এ অঞ্চলকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উপভোগ করতে আসে।

This website uses cookies.