ক্ষোভের মুখে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা

1প্রথম সকাল ডেস্ক: সোমবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। সদ্য অনুমোদিত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা অনুমোদনের সাথে সাথে তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে গণমাধ্যমকে। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্টরা বলছে, এই নীতিমালা গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী এবং জনবান্ধব করে তুলবে। কি আছে নীতিমালাতে: সদ্য অনুমোদন হওয়া নীতিমালায় ৭ টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে পটভূমি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিমালা বাস্তবায়নের কৌশল উল্লেখ রয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদান ও পদ্ধতি এবং সম্প্রচার কমিশনের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচারের বিষয়ে বলা হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে। কী কী বিষয় অনুসরণ করে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে চতুর্থ অধ্যায়ে। পঞ্চম অধ্যায়ে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে আরো কিছু বিবেচ্য বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। কোন কোন বিষয় সম্প্রচার করা যাবে না, করা সমীচীন হবে না, তার উল্লেখ রয়েছে এখানে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে সম্প্রচার কমিশন সম্পর্কে বলা হয়েছে। কমিশন গঠন, আইনি কাঠামো, দায়িত্ব, কাজের পদ্ধতি, কী কী অভিযোগ কমিশন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করবে এ বিষয়গুলো এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে সম্প্রচার কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত কিভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হবে সে বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়। সম্প্রচার নীতিমালা অনুযায়ী সম্প্রচার করা যাবে না বা সম্প্রচারের সময় কঠোরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে এমন অন্যতম নীতি হচ্ছে:- সশস্ত্র বাহিনী বা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কোনো বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ, অবমাননা বা বিদ্রৃপ করে কিছু প্রচার করা যাবে না বা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে- এমন সামরিক, বেসামরিক ও সরকারি তথ্য প্রচার করা যাবে না। জাতীয় আদর্শ ও উদ্দেশ্যের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রৃপ করা, জনগণের প্রতি অবমাননা, স্বাধীন অখণ্ড বাংলাদেশের সংহতি ক্ষুণ্ন হতে পারে- এমন বক্তব্য প্রচার করা যাবে না, যাতে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। বিভিন্ন শ্রেণি ও ধর্মের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে বা ধর্মের প্রতি অবমাননা হয়- এমন কিছু প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তির গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করে- এমন কিছু প্রচার করা যাবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আঘাত করতে পারে, আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারো- এমন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অনুকূলে যায়, যাতে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র আঘাত পায় কিংবা যাতে বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে রকম কিছু প্রচারে বিধি-নিষেধ রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠী বা জাতির জন্য ক্ষতিকর দৃশ্য প্রচার করা যাবে না। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে- এমন কোনো বিদ্রোহ, নৈরাজ্য, হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন পরিহার করতে হবে। দুর্নীতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎসাহ প্রদান করে- এমন কিছু প্রচার করা যাবে না। অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন, রীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কেন চিন্তিত গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা: নীতিমালায় সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচারে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও কবে তা করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ নেই। নীতিমালার নামে সম্প্রচার-মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে বলে অভিমত গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের। অথচ সম্প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি স্বাধীন কমিশন চেয়েছিলেন। কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রচার-সম্পর্কিত সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টদের কাছে এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) ৬ আগষ্ট বুধবার সম্প্রচার নীতিমালা পর্যালোচনার জন্য সভা ডেকেছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ সমাবেশ করে নীতিমালার কপিতে আগুন দিয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ চলছে সামাজিক গণমাধ্যমে। কে কী বলেন: সম্প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মানবাধিকার সংস্থা, একাধিক সাংবাদিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, যেভাবে নীতিমালাটি হয়েছে তাতে সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, এই মাধ্যম সংকুচিত হবে। বিশেষ করে, কমিশন গঠনে সময়সীমা ঠিক না করে তার আগ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হাতে সব সিদ্ধান্তের ক্ষমতা রাখায় নিয়ন্ত্রণের সুযোগটি বাড়বে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, মানবাধিকার, সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু : সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। গণমাধ্যম জগতে নতুন দিন উন্মোচনকারী পদক্ষেপ এটি। কারণ বিকশমান সম্প্রচার জগৎ গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে। বহুবাদ ও বৈচিত্র্য বজায় থাকবে এ নীতিমালায়। গণমাধ্যমকে সংকুচিত করার জন্য নীতিমালা করা হয়নি। এ নীতিমালার মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী: বলেন, সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমকে জবাবদিহির আওতায় আনার ধোয়া তুলে সরকার আইন করতে যাচ্ছে। টেলিভিশন বন্ধেও নাকি আইন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি মনে করে গণমাধ্যমকে খাঁচায় পুরতে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে এসব করছে। এটা বাকশাল কায়েমের একটি ভিন্ন পন্থা। সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন, রেডিওসহ গণমাধ্যমের সকল শাখাকে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনার জন্য সরকার বেশকিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। টেলিভিশন বন্ধেও নাকি আইন হচ্ছে। আমরা মনে করি বিভিন্ন আইন-নীতিমালা করে গোটা গণমাধ্যমকে তারা সরকারি খাঁচায় পুরতে চাচ্ছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: বলেন, সাংবাদিকতার নামে যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন সেদিকেও আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। রাত ১২টার পরে দেখা যায় বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ নেই। যে যার মতো যা ইচ্ছা করতে থাকেন, বলতে থাকেন। বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু এগুলো সাংবিধানিকভাবে আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। এর আগে কোনো নীতিমালা ছিল না। যে যার সুবিধা মতো কাজ করেছে। বর্তমান সরকার এবার একটি নীতিমালা তৈরি করেছে। এটা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ নীতির কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এটা আমাদের মৌলিক অধিকার। তবে এর মাধ্যমে যেন গণমাধ্যমের অধিকার হরণ না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা: বলেছেন, ‘আলোচনা অনুষ্ঠানে (টক শো) কোনো বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রচার পরিহার করতে হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে সব পক্ষের যুক্তি যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে। বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল: বলেন, ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা করার ইচ্ছাপত্র প্রকাশ করেছে সরকার। কিন্তু নীতিমালা তৈরি হয়নি। নীতিমালা তৈরি করবে সম্প্রচার কমিশন। কমিশন কত দিনের মধ্যে ও কাদের নিয়ে গঠিত হবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। এখানেই আমাদের উদ্বেগ। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিশন গঠন করা হবে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে। আর কমিশন কম সময়ের মধ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করতে সমর্থ হবে- এটা আমরা দেখতে চাই। বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন এটকোর সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল আইয়ের পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ: বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের ভাষণসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা না রাখা এবং লাইসেন্স স্থগিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা মতামত দিয়েছি। আশা করব, আমাদের মতামতের ভিত্তিতেই নীতিমালাটি করা হবে, যা সম্প্রচারমাধ্যমকে আরও এগিয়ে নেবে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতে হবে; কিন্তু স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারী হওয়া উচিত না। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ: বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা প্রত্যাহারের জন্য সংবাদ মাধ্যমগুলো ও সম্পাদকদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করা হবে। এর মাধ্যমে সম্প্রচার নীতিমালার বিরুদ্ধে সারাদেশে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সম্প্রচার নীতিমালা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে কোনো কথা হবে না। জাতীয় প্রেসক্লাবের কোনো প্রোগ্রামে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না। মিডিয়াতে কেউ যেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলতে পারেন, সেজন্য এই নীতিমালা করা হয়েছে। এ নীতিমালার আইনি কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় যে সম্প্রচার নীতিমালা করতে যাচ্ছে তা সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করবে। এ নীতিমালার মাধ্যমে টক-শোকেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হবে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করার হীন উদ্দেশ্যেই সরকার নতুন সম্প্রচার নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। রেডিও এবং টেলিভিশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নীতিমালার কয়েকটি ধারা বেশ স্পর্শকাতর। সেগুলো অপব্যবহারের আশঙ্কা আছে। এই ধারাগুলোর কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় তাঁরা এই আশঙ্কা করছেন। প্রসঙ্গত, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের ক্ষমতা সন্নিবেশিত করে দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ সংশোধনেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের ক্ষমতা জেলা প্রশাসককে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। যদিও তথ্যমন্ত্রী এই উদ্যোগের কথা অস্বীকার করেছেন।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *