ক্যানসার থেকে বাচলো নীল তিমি

101554 (4)প্রথম সকাল ডেস্ক: স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে ক্যানসার ভাইরাসের বসতি কম করে হলেও ১০ কোটি বছর আগে থেকে। অনলাইন জার্নাল ‘প্লস প্যাথোজেনসে’ এ বছর ১৭ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এমনটাই দাবি করেছেন একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। ছোটদেহী প্রাণীদের তুলনায় অতিকায় শরীরী প্রাণীদের ক্যানসার-ঝুঁকি অনেকখানি কম, সেটাও উঠে এসেছে তাদের গবেষণায়। বোঝা গেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমির ক্যানসার ঝুঁকি কেন কম। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিবর্তন-রেখার উল্টো পথে জ্ঞানের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে বিজ্ঞানীরা পৌঁছে যান প্রায় ১০ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে। তারা অবাক হয়ে দেখেন, ওরকম অতিপ্রাচীন কালে স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহে এমন একটা ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটে যা ক্যানসারের জন্য দায়ী। ভাইরাসটির নাম ‘এন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস’। যদি কখনো কোনো প্রাণীকে রেট্রোভাইরাস আক্রমণ করে, তবে সেই ভাইরাসটি ওই প্রাণীর জিনোমে মিশে যায়। কখনো কখনো ওই ভাইরাসের ছাপ প্রাণীটির প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হতে থাকে। তখন ওই ভাইরাসটিকে বলা হয় ‘এন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস (ইআরভি)।জিনোমের এক অংশে একবার ঢুকে পড়লে ইআরভি অন্য অংশেও সহজেই কপি হয়ে যেতে পারে। কম্পিউটারে যেমন দেখা যায়, একটা ভাইরাস কীভাবে সেকেন্ডের মধ্যে সব ফোল্ডারে কপি হয়ে যায়। আপনা-আপনি কপি হয়ে যায় বলে কোষে ক্যানসার সৃষ্টির আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে ইআরভি। স্তন্যপায়ী প্রাণীর জিনোমে কালের পর কাল ধরে প্রাচীন ভাইরাসেরা কীভাবে আস্তানা গেঁড়ে আছে, প্রবাহিত হচ্ছে- এই নিয়ে গবেষণা করছিলেন পাঁচ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। এরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, পলিম্যাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। এদের মধ্যে আছেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী- সুনেত্রা গুপ্ত, জন্ম যার কলকাতায়। বিজ্ঞানসাধনার পাশাপাশি বাঙালি এই নারী উপন্যাসও লিখেন; এ জন্য তিনি পুরস্কারও পেয়েছেন। বর্তমানে সুনেত্রা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপনা করছেন। সুনেত্রা গুপ্তা এবং তার সহ-গবেষকরা বেছে নিয়েছিলেন ৩৮টি স্তন্যপায়ী প্রাণীর জিনোম। এর মধ্যে ছিল মানুষের জিনোম। তারা কাজ করছিলেন ভাইরাসের ভস্মাবশেষ (ভাইরাল রেলিক) নিয়ে। আদিতে আমাদের জিন কীভাবে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করত তার সাক্ষী হিসেবে ভাইরাস-ভস্মই বেশি সমাদৃত বিজ্ঞানীদের কাছে। ৩৮টি স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে গবেষকরা ২৭ হাজার ৭১১টি ইআরভি চিহ্নিত করেছেন যারা দশ কোটি বছর আগে থেকে প্রবাহিত হয়ে আসছে। প্রাণীর শরীরের আকারের ওপর ইআরভির একটা উল্লেখযোগ্য সম্পর্কও তারা টের পেয়েছেন। প্রাণীটি যদি দেহে বড় হয় তাহলে সে তার জিনোম থেকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ভাইরাল রেলিককে অনেকখানি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। যেমনটা বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ইঁদুরের জিনোমে মানুষের চেয়ে দশগুণ ইআরভি আছে। আবার মানুষের জিনোমে থাকা ইআরভির ছয় ভাগের মাত্র একভাগ ইআরভি আছে ডলফিনের জিনোমে। মানে, তুলনামূলক বড় প্রাণীর ক্যানসার ঝুঁকি কম। এখানে একটা গেরো বেঁধে যাচ্ছে। গেরোটা সাদা চোখে ধরা পড়ছে না, তাই তো? আগেই বলেছি, একটা প্রাণীর প্রতিটা কোষেই ভাইরাস-ভস্ম সংরক্ষিত থাকে। এবার কল্পনা করুন, ইঁদুর আর ডলফিনের কথা। যে প্রাণী যত অতিকায়, তার দেহে কোষের সংখ্যাও তত বেশি। ইঁদুরের চেয়ে ডলফিন অনেক বড় প্রাণী। ডলফিনের দেহে কোষের সংখ্যা তাই অনেক বেশি। প্রতিটা কোষেই যদি ভাইরাস-ভস্ম লুকিয়ে থাকতে পারে, তাহলে ডলফিনের দেহে ইঁদুরের চেয়ে অনেক বেশি ইআরভি থাকবে। আর ইআরভি বেশি থাকা মানে ক্যানসার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ বড় প্রাণীদের ক্যানসার ঝুঁকি বেশি! গবেষণার সঙ্গে জড়িত পলিম্যাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী রবার্ট বেলশা বলছেন, ‘তাহলে তো, নীল তিমি এতদিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী প্রাণী এবং সবচেয়ে বড় প্রাণী হলো নীল তিমি। শুধু জিহ্বাটাই আস্ত একটা হাতির সমান ভারী, মোটরগাড়ির সমান ভারী হৃদপিণ্ড। যে প্রাণী যত বড় তার দেহে তত বেশি কোষ। প্রতি কোষেই যেহেতু কপি হয়ে থাকতে পারে ইআরভি, তাহলে বড় প্রাণীদের দেহে ইআরভির সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। সেই হিসেবে সবচেয়ে বেশি ইআরভি থাকবে নীল তিমির দেহে। কিন্তু কী আশ্চর্য, নীল তিমির দেহেই ইআরভির পরিমাণ সবচেয়ে কম। কেমন একটা গেরো লেগে গেল না? ‘‘এটাই সেই গেরো,’ বলছেন বেলশা, ‘এই গেরোকে বলা হয় ‘পেটোর গেরো’। বিজ্ঞানী স্যার রিচার্ড এই বিষয়টা প্রথম উত্থাপন করেছিলেন, তাই তার নামেই এমন নাম। বিবর্তনীয় চাপ, আর যাই হোক, ক্যানসারের কবল থেকে বাঁচিয়েছে নীল তিমিকে। অথচ শিকার-প্রবৃত্তির মানুষের জন্য নীল তিমির নাম এখন বিপন্ন প্রাণীর তালিকায়। এ লজ্জা কি মানুষ পাবে না? তার মানে দাঁড়ালো, কোষ বেশি হলেও বড় প্রাণীদের শরীরে ইআরভির পরিমাণ কম থাকে। যেমন বেলশা ও তার সহ-গবেষকরা দেখেছেন, ডলফিনের দেহে ইআরভির পরিমাণ ইঁদুরের দেহের ইআরভির ৬০ ভাগের একভাগ মাত্র। ১৯ গ্রাম ভরের ইঁদুরের শরীরে পাওয়া গেছে ৩৩৩১টি ইআরভি, আর ২৮১ কেজি ভরের ডলফিনের দেহে মাত্র ৫৫টি। আর ৫৯ কেজি মানুষের শরীরে মিলেছে ৩৪৮টি ইআরভি। প্রশ্ন হচ্ছে, বেশি কোষ থাকা সত্ত্বেও বড় প্রাণীদের জিনোমে ইআরভির পরিমাণ কম হয় কী করে? ‘নিশ্চয়ই বড় প্রাণীরা এমন কোনো উপায় জানে যার মাধ্যমে তারা জিনোম থেকে ইআরভিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’ মন্তব্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী আরিস কাটজুরাকিসের। আলোচিত গবেষণাটির ইনিই প্রধানতম ব্যক্তি। কাটজুরাকিস ব্যাখ্যা করেছেন, ‘প্রাণী যত বড় হয়, তার দেহে কোষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কোষ বৃদ্ধির সময় নানাবিধ ভুল (যার কারণে ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে) হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে কোষে ইআরভি কমানোর জন্য অতিকায় প্রাণীদের ওপর এক ধরনের অবধারিত চাপ কাজ করে। এই চাপটা হলো বিবর্তনীয় চাপ। তার মানে বিবর্তনীয় চাপে পড়ে বড় প্রাণীদের লাভই হয়েছে। ছোটদের তুলনায় বড় প্রাণীদের অ্যান্টি-ভাইরাল জিন বেশি সক্রিয়। তা-ই যদি হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন ও অধিক কার্যকরী অ্যান্টি-ভাইরাল থেরাপি বানানো সহজতর হবে। এই গবেষণার অন্যতম বিজ্ঞানী জিকাস ম্যাগোরকিনিস বলেছেন, ‘মানুষের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য ইআরভি দায়ী কি না, এ বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও নেই। কিন্তু অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন ইঁদুরের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি করে ইআরভি, তাই মানুষের ইআরভি নিয়ে বিস্তর গবেষণার দরকার আছে। আরেকটি বিষয় কি গবেষণার দাবী রাখবে না, বড় প্রাণীদের ক্যানসার ঝুঁকি যদি কমই হবে তাহলে মানুষের বেলায় কেন বলা হয়, বড়দের ক্যানসার ঝুঁকি বেশি?

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *