ভুতের কেল্লা

indexপ্রথম সকাল ডেস্ক: বাঙালি ভ্রমণপিপাসু নয়, এ অভিযোগ বেশ পুরনো। কিন্তু সময় পাল্টাচ্ছে। দুদিনের ছুটি মিললেই অনেকেই বেড়াতে যান ঢাকার বাইরে। অনেকে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ছুটির দিনগুলো ঘুরে বেড়ান নতুন কোনো জায়গায়। শখ এবং সাধ্য থাকলে দেশের বাইরেও ঘুরতে যান অনেকে। অবশ্য এ শুধু শিক্ষিত, শহুরে মানুষের গল্প। তা হোক, ‘ঘরকুনো’ বাঙালি ভ্রমণে উৎসাহিত হচ্ছে। আর ঈদ এলে তো কথাই নেই। জামা কাপড়, খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি কোথায় বেড়াতে যাবেন সেই পরিকল্পনাও সেরে ফেলেন অনেকে। পরিকল্পনাটা এবার আর কক্সবাজার বা বান্দরবান নয়, একটু অন্যরকম হলে কেমন হয়? ভ্রমণ করতে গিয়ে যদি একটু অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাওয়া যায় তাহলে মন্দ হয় না। বিশেষ করে বেড়াতে গিয়ে যদি একটু ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা পেতে চান তারা ভানগড়ের কেল্লা আর ভানগড় শহর ঘুরে আসতে পারেন। বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গার ইতিহাস জেনে নেয়া উচিত। সে উদ্দেশেই জানিয়ে রাখি,  ১৫৭৩ সালে ভারতের রাজস্থানে ভানগড় কেল্লা তৈরি করেছিলেন অম্বরের শাসক রাজা ভগবন্ত দাস। কিন্তু অর্ধশতকের মধ্যেই ঘনিয়ে আসে পতন। ১৬৩০ সালে ছত্র সিং-এর শাসন থেকেই শুরু হয় ক্ষয়। ১৭৮৩ সালের দুর্ভিক্ষে এই নগরী পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এটুকু পরেই আপনি হয়তো ভাবছেন, এমন জায়গা তো এ দেশেই অনেক আছে। তাহলে কষ্ট করে সেখানে যাওয়া কেন? এর উত্তর হলো, এই কেল্লা হলো এশিয়ার সবচেয়ে ভূতুড়ে জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম। শুধু তাই নয়, বিশ্বের সেরা দশটি হন্টেড জায়গার মধ্যে একটা এই ভানগড়ের কেল্লা। দিল্লি থেকে ৩০০ কিমি দূরে রাজস্থানের জয়পুর এবং আজমেড়ের কাছে ভানগড় এলাকাকে বলা হয় রাজস্থানের ভূতুড়ে জনপদ। আরাবল্লীর সানুদেশে এই কেল্লায় নেই ইলেক্ট্রিসিটি। আর ঘন অন্ধকারে আরও জমাট বেঁধেছে ভূতুড়ে গল্প। রাজার কেল্লায় ভূত এলো কী করে, এমন কথাই ভাবছেন তো? এ নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন গল্প প্রচলিত আছে। তবে, এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত গল্প হলো, গুরু বালুনাথ ও রানী রত্নাবতীর গল্প। স্থানীয়রা বলেন, মাধো সিং (ছত্র সিংয়ের বাবা) যখন প্রথম ভানগড়ের কেল্লা তৈরি করাচ্ছিলেন তখন এই কেল্লা তৈরিতে বাধা দেন এক সাধু। তার নাম গুরু বালুনাথ। কেল্লার চত্বরের এককোণে বালুনাথের আশ্রম ছিল।  মাধো সিংকে গুরু বালুনাথ আদেশ দিয়েছিলেন, তিনি কেল্লা বানাচ্ছেন তাতে তার আপত্তি নেই। তবে কেল্লার ছায়া যেন তার আশ্রমের উপর না পড়ে। ছায়া পড়লে তিনি মাধো সিংয়ের এই সাধের কেল্লা ধ্বংস করে দেবেন। এই হুমকি দিয়েই কিন্তু তিনি ক্ষান্ত হননি। রাজবংশের সবাইকে নাশ করার কথাও বলেছিলেন তিনি। ভয়েই হোক কিংবা সাধুর প্রতি শ্রদ্ধায় মাধো সিং কথা দিয়েছিলেন, বালুনাথের আদেশ তিনি পালন করবেন। কিন্তু কেল্লা বানানোর পর দেখা গেল, দিনের একটা সময় কিছু সময়ের জন্য হলেও কেল্লার ছায়া বালুনাথের আশ্রমের উপর এসে পড়ে। ব্যস, এতেই প্রচণ্ড রেগে গেলেন বালুনাথ। ক্ষুব্ধ হয়ে বালুনাথ ভানগড়ের কেল্লার সঙ্গে গোটা ভানগর রাজ্য ধ্বংস করে দিলেন। ভানগরে গেলে দেখবেন, সেখানে বাড়ির অভাব নেই। অথচ কোনো বাড়ির ছাদ নেই। স্থানীয়রা বলেন, গুরুনাথ চেয়েছিলেন এই এলাকায় অন্য কেউ এসে যাতে বসবাস করতে না পারে, সেই কারণেই তিনি বাড়ির ছাদ উড়িয়ে দিয়েছেন। ভানগরের এই ভূতুড়ে কেল্লার গল্প এখানেই শেষ নয়। আরও অনেক কাহিনি রয়েছে এই কেল্লাটিকে কেন্দ্র করে। রানী রত্নাবতীর গল্প অন্যরকম। রত্নাবতী ভানগরের রানী ছিলেন। অসামান্য সুন্দরী হওয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে রাজারা আসতেন রত্নাবতীকে রানী করার প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু রূপের অহঙ্কার ছিল রত্নাবতীর। তাচ্ছিল্য করে তিনি সবাইকেই ফিরিয়ে দিতেন। রানীর এলাকায় বাস করত সিঙ্ঘিয়া নামের এক তান্ত্রিক। সে রানীর প্রেমে মাতোয়ারা ছিল।  একদিন রানী দাসীদের নিয়ে সুগন্ধী কিনতে বের হয়েছেন। তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়া সুযোগ বুঝে সুগন্ধীতে মন্ত্র পড়ে দেন। সিঙ্গিয়ার মতলব ছিল, রানী এই গন্ধ শুঁকলেই বশীভূত হয়ে পড়বেন ও সিঙ্ঘিয়ার পেছনে পেছনে চলে আসবেন। কিন্তু রূপের সঙ্গে রত্নাবতীর বুদ্ধিও ছিল বেশ! তিনি সিঙ্ঘিয়ার এই ছল বুঝতে পেরে সুগন্ধীর বোতল একটি পাথরে ছুঁড়ে মারেন। জাদুবলে ওই পাথরটি বশীভূত হয়ে সিঙ্ঘিয়ার পেছনে ছুটতে শুরু করে। ফলে ওই পাথরের তলায় চাপা পড়ে সিঙ্ঘিয়া মারা যায়। মৃত্যুর আগে সে রানীকে অভিশাপ দিয়ে যায়, রাজপরিবারের কাউকে সে বাঁচতে দেবে না। আর রানীকে সে মরার পরেও ছাড়বে না। এর কিছুদিন পর পাশ্ববর্তী রাজ্যের সঙ্গে ভানগড়ের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে রাজপরিবারসহ গোটা ভানগর ধ্বংস হয়ে যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস ওই কেল্লায় নাকি তান্ত্রিক ও রত্নাবতীর অতৃপ্ত আত্মা এখনও ঘুরে বেরায়। কেল্লাকে ঘিরে একের পর এক গল্প তৈরি হলেও, এলাকার কেউ কখনও ভূতের দেখা পাননি। তবে রাতে তারা কেল্লা থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। যদিও কেল্লা এখন ধ্বংসস্তুপ ছাড়া কিছুই নয়। তবে স্থাপত্য নিদর্শনের চিহ্ন রয়েছে। কেল্লায় প্রবেশের দরজার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। দরজা দিয়ে ঢুকলেই বাগান। বাগানে ফুলের সুবাস সব সময় পাওয়া যায়। প্রচণ্ড খরাতেও এই বাগানে কোনো ফুল নাকি শুকিয়ে যায় না। এও এক রহস্য বটে! বাগান পেরিয়ে সামনে এগুলেই জলাধার দেখতে পাবেন। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বউলি’ বলে। বাউলির এই অংশ থেকেই অনেকে নূপুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। যদিও কেল্লার কোনো শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায় না। দিল্লি হয়ে জয়পুরের দিকে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্ব ভানগর কেল্লা। ভানগরে ঘুরতে গেলেও সেখানে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। ফলে ভানগড় ঘুরে আপনাকে ৫০ কিলোমিটার দূরের সিরিস্কায় যেতে হবে। রাজস্থান পর্যটনের টাইগার ডেনও হতে পারে আপনার রাত কাটানোর আস্তানা। তবে ভানগড়ে যাওয়ার আগে একটা কথা জেনে নিন। এখানে সূর্যাস্তের পর আর সূর্যোদয়ের আগে প্রবেশ একেবারেই নিষেধ। ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে এই কড়া নির্দেশ। কেউ এই আদেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভারত সরকার কড়া ব্যবস্থা নিতে পারে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *