হুমায়ূন আহমেদের স্কুল

012454তাপস রায় : তিনি নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং দেখাতেন। অসংখ্য ভক্ত-পাঠক তার লেখায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তেন আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা। কিন্তু এ শুধু ‘কথার কথা’ ছিল না। বিভিন্ন সময় আমরা তাকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু উদ্যোগ নিতে দেখেছি। এর উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই তার নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের কথা বলা যায়। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম কুতুবপুর। এই গ্রামেই ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর হুমায়ূন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় তো বটেই এই একুশ শতকে এসেও গ্রামটির আশেপাশে ছয় মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল নেই। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ সিদ্ধান্ত নেন, গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। এ উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে তিনি কাজ শুরু করেন। নাট্যাভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এই বিদ্যাপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্কুল ভবনের নকশা এঁকে দেন মেহের আফরোজ শাওন। ২০০২ সালে স্কুলটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। নির্মাণকালে নির্ধারিত বাজেট শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছু কাজ বাকি রয়ে যায়। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সময় হুমায়ূন আহমেদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কেউই তার এই শুভ উদ্যোগে সাড়া দেননি। এই সুযোগে স্থানীয় বখাটেরা স্কুলে আড্ডা জমিয়ে তোলে। অবহেলায় নষ্ট হতে থাকে স্কুলের দরজা জানালা। এমনকি স্থানীয় মানুষ স্কুলের মাঠে চাষ করতে শুরু করে দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত থাকার পর হুমায়ূন আহমেদ বাধ্য হয়ে নিজেই এটির হাল ধরেন। শুরু হয় স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম। ২০০৮ সালে মাত্র ৪৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে  স্কুলটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এ বিদ্যাপীঠে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াইশ’। শুরু থেকেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট বেশ ভালো। মেধা তালিকায় স্থান অর্জনসহ শিক্ষার্থীদের পাসের হার শতভাগ। শুরুতে হুমায়ূন আহমেদ স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেই স্কুল সম্পর্কে সব সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন। তার মৃত্যুর পর এ দায়িত্ব পালন করছেন তার সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন। স্কুলটির অন্যতম বৈশিষ্ট এই যে, একাত্তরে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান একাত্তরে শহীদ হয়েছেন। বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি বাবার নামে এই স্কুলের নামকরণ করতে পারতেন। মা আয়েশা ফয়েজেরও এমনটাই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে দেশের সব শহীদের কথা ভেবে তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্কুলের নাম দেন শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকতেই এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান একা চালানো সম্ভব নয় ভেবে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে স্কুলের দায়িত্ব ভার নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কেউই দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখায়নি। তার জীবদ্দশায় দেশের প্রথিতযশা অনেক কবি-সাহিত্যিক ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অজপাড়াগাঁয়ের এ বিদ্যাপীঠে এসে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেগুলো পূরণ হয়নি। তার মৃত্যুর পর কেউই আর এ বিদ্যাপীঠের খোঁজখবর রাখেন না। অথচ হুমায়ূন আহমেদ স্বপ্ন দেখতেন এবং গর্ব করে বলতেন, ‘আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি পুরো বাংলাদেশে এই স্কুলের চেয়ে সুন্দর স্কুল নেই, কোন স্কুলের এত বড় লাইব্রেরি নেই, এত কম্পিউটার নেই। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমি এটিকে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই, যাতে শিক্ষার জন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের আর শহরে যেতে না হয়। উল্টো শহরের শিক্ষার্থীরাই গ্রামে চলে আসে। শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, এ স্কুল ঘিরে হুমায়ূন স্যারের অনেক স্বপ্ন ছিল। স্যার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তবে স্যার বেঁচে থাকতে স্কুলটি সব সময় জমজমাট থাকত। স্যারের মৃত্যুর পর এখন আর তেমন কেউ আমাদের খোঁজ নেন না। স্কুলটি আজও এমপিওভুক্ত হয়নি। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সরকারি অনুদান  পাওয়া যায় না। অথচ প্রতিষ্ঠানটির এমপিওভুক্ত হওয়ার সব যোগ্যতা রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যুর কারণে বিদ্যালয়টির ভবিষ্যত নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। নানামুখী সঙ্কটের আশঙ্কা করছেন অনেকে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৫ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে  বিদ্যালয়টিতে পল্লী বিদ্যুত ছাড়াও সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। ১০টি কম্পিউটার ও একটি প্রজেক্টর দিয়ে চালু করা হয়েছে কম্পিউটার ল্যাব। পাঠাগারে বই আছে চার হাজারের বেশি। সবই হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব অনুদানে কেনা। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আবাসিক ভবন এবং একটি অডিটরিয়াম করারও স্বপ্ন ছিল হুমায়ূন আহমেদের। তিনি আজ নেই। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কেউ এগিয়ে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *