যৌনকর্মীদের আতঙ্কের ঈদ

11144441 (8)প্রথম সকাল ডেস্ক: ‘একটা পোলারে তো এ ঈদে দেখার ভাগ্যই হইল না। এই প্রথম আমি দুই পোলারে একসাথে নিয়া ঈদ করতে পারলাম না। ছোট পোলাডারে আমার কাছে রাখতে পারলেও, বড়টা আছে মা’র কাছে। আর কেমনেই বা রাখুম? নিজের নিরাপত্তারই ঠিক নাই। টাঙ্গাইলের কান্দপাড়া যৌনপল্লীর কর্মী টিয়া এই প্রতিবেদককে বলছিলেন কথাগুলো। কান্দপাড়ার যৌনপল্লীটি এখন আর নেই। শত বছরের পুরনো যৌনপল্লীটি গত ১৩ জুলাই সকালে দুই ঘণ্টার মধ্যে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। সাথে সাথে সেখানকার ৮০৪টি ঘরে বসবাসরত প্রায় ৯০০ জন যৌনকর্মী আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। টিয়ার দুইটি ছেলে সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে এবং ছোট ছেলে ২য় শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। টিয়া যখন শিশু তখন তাকে কুড়িয়ে এ যৌনপল্লীতে নিয়ে আনা হয়। তারপর থেকে যৌনপল্লীতেই কেটেছে তার জীবন। যৌনপল্লীর আর সকল মেয়েদের সাথে পরিবারের মতো বসবাস করেছেন। তিনি বলেন, ঐ দিনের ঘটনার পর এই বাড়ি ওই বাড়ি পালাইয়া বেড়াইতাছি। এহন আছি আমার এক বইনের বাসায়। এহানে বেশিদিন থাকন যাইব না। দেহি আরেক ভাইয়ের বাসা আছে ঐ দিকে যামু। ওরা কেউ আমারে সহ্য করতে পারে না। যেহানে দুইবেলা খাইতাম, সেহানে একবেলা খাইয়া থাকি। নাইলে খারাপ কথা শুনতে হইব। এমনেই তো ওগো লগে থাকতাছি, খাওন বেশি খাইলে কইব সব খাইয়া হালাইলো। টিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, প্রতিবছর কত মজা কইরাই না ঈদ করতাম। দুই পোলা আমার লগেই থাকতো। এলাকার সব মাইয়ারা (যৌনকর্মী) ওগো পোলাপাইন লইয়া এক লগে মজা করত। এ ঈদে তো কারো কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। সবাই পালাইয়া বেড়াইতাছে। অনেকের লগে যহন মাঝে-মইধ্যে ফোনে কথা হয় তহন ওরা চিক্কর পাইরা (চিৎকার করে) কান্দে। কেউরেই কেউ আশ্রয় দেয় না। বাইরে কোনো মাইয়ারে পাইলেই কাকন ভাইয়ের (স্থানীয় মেয়রের ভাই) নাম লইয়া ওরা মারে। বাইরে বাইর হইতেই ডর লাগে। তিনি আরও বলেন, বাকি মাইয়াগো খবর জানি না। কাম-কাইজ পাই না, তাই কোন ইনকামও নাই। কয়দিন এইদিক, কয়দিন ওইদিক কইরা অন্যের ঘাড়ে বইয়া খাইতাছি। ভাল মাইয়ারাই কাম পাইতাছে না, আর আমি কেমনে পামু। এমনে কইরা আর কয়দিন চলন যায়? যৌনকর্মীদের নেত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, যৌনকর্মীরাও ভোট দেয়, তাই যৌনকর্মীদের সামাজিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অসামাজিক প্রতিরোধ কমিটির নামে একটি সংগঠন লিফলেটের মাধ্যমে গত ৪ জুলাই টাঙ্গাইলে যৌনপল্লীতে ধর্মবিরোধী কাজ করা হচ্ছে বলে প্রচারণা চালিয়ে ষড়যন্ত্র করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলের মেয়র ও প্রভাবশালী এমপিরা গোপন বৈঠক করে যৌনপল্লী উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। পরে ১২ জুলাই যৌনপল্লীর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ১৩ জুলাই যৌনপল্লীটি মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয় তারা। তিনি আরও বলেন, সমাজই তার প্রয়োজনে এ পেশার সৃষ্টি করেছে। অভাবের তাড়নায়, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে প্রতারিত হয়েই আমরা এ পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। সমাজ-রাষ্ট্রের অস্বীকৃতির ও অগ্রহণমূলক মনোভাবের জন্য যৌনতা বিক্রির বৃত্তিতে নিয়োজিত নারীরা একজন নাগরিকের প্রাপ্য কোনো অধিকার পাচ্ছে না। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন অত্যাচার ও নিপীড়নের। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। কি দোষ এতগুলো নারীর? কেন তারা ঈদ উদযাপন থেকে বঞ্চিত হবেন? কথা হয় কল্পনার সঙ্গে। ছোটবেলা থেকেই টাঙ্গাইলের যৌনপল্লীতে বড় হয়েছেন তিনি। কারণ তার মা-ও এখানকার যৌনকর্মী ছিলেন। কল্পনা নিজেও এক কন্যা সন্তানের জননী। কয়েক বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। কল্পনা বলেন, আমাদের এই দুরবস্থা করছে ঐ এলাকার মেয়র ও তার ভাই কাকনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা। উচ্ছেদের পর কোনো যৌনকর্মীকে কোথাও থাকতে দিতেছে না। রাস্তায় পাইলেই তারা যৌনকর্মীদের মারধর করে। জীবনের ঝুঁকি নিয়া বাইর হইতে হয়। ফোনে অনেকের লগে কথা কইছি। কিন্তু ঐ ঘটনার পর কারও লগে দেহা করতে পারি নাই। ঐ ঘটনার পর ৭৭৪ জন যৌনকর্মীর লগে ১৪০ জন শিশু আশ্রয়হীন হইছে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তিনি বলেন, বুঝতে পারি নাই হঠাৎ কেমনে এ ঘটনা হইল। অনেক আগেও এ যৌনপল্লী একবার উচ্ছেদ করতে চাইছিল অনেকে। তহন পারে নাই। কিন্তু ওইদিন মাত্র দুই ঘণ্টার মইধ্যে সব শেষ কইরা দিল। যারা মানুষ তারা ঐ ঘটনা কহনো দেখতেও পারব না। ওরা নামকরা গুন্ডা। খুন করতেও ওদের বাধে না। মেয়রের বাড়ি পল্লীর সামনে হওয়ায় কয়দিন পরপরই এহন টহল দেয় তারা। জীবনের মায়া তো সবারই আছে। শুনতেছি আমরা নাকি আগের যায়গা ফিরা পামু। কতগুলা এনজিও চেষ্টা করতেছে। বিদেশেও নাকি জানাজানি হইছে। অতীত স্মৃতি স্মরণ করে কল্পনা বলেন, আগে ঈদে কত আমোদ-ফূর্তি করছি। সবাই এক পরিবারের মত থাকছি। ঈদের দিন এক লগে পোলাপাইন লইয়্যা সেমাই-মিষ্টি রান্না কইরা খাইছি। গান-বাজনা হইছে। কত ধরনের মানুষ আইতো। ভরপুর থাকত পল্লী। আগের ঈদগুলিতে মাইয়ার লগে দেহা করতে পারছি। এইবার আমি মাইয়ার লগে দেহা করি নাই। ওরেও এদিকে আইতে কই নাই। বুঝেনই তো আমগো কেউ মানতে পারে না। আমি চাই না আমার কারণে ওর সংসারে কোন অসুবিধা হোক। এহন যেহানে থাকি, সেহানে কেউ আমারে চিনে না। আশপাশের মানুষও না। চিনলে অপমান-অপদস্তের শিকার হইতাম। আমাগো নেত্রীও জানি না কই আছে। তবে টাঙ্গাইলে নাই। কপালে আর ঈদও নাই।