সাজানো হচ্ছে শোলাকিয়া ঈদগাহ্ মাঠ

012 (4)প্রথম সকাল ডেস্ক: উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। প্রতিবছরেরন্যায় এবারও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদ গাহ মাঠে। এবার শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের জামাত সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে। এবার ১৮৭তম ঈদ-উল-ফিতরের জামাতে ইমামতি করবেন আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। গত ২১শে জুলাই সোমবার বিকেলে জেলা কালেক্টরেট সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ঈদ উপলক্ষে এক প্রস্তুতি সভায় একথা জানানো হয়। এছাড়াও ইতিমধ্যে ঈদগাহ্ সুসজ্জিতকরণ, দাগ কাটার কাজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, অজুখানায় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় শেষ হয়েছে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদেরেও নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ এস.ভি. সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে সকাল নয়টায় ঈদ-উল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত ঈদ-উল-ফিতরের জামাতে ইমামতি করবেন মাওলানা সানাউল্লাহ। মহিলাদের জামাতে হাজার হাজার মহিলা অংশ গ্রহন করে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এস এম আলম। এক নজরে- ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ইতিহাস: কিশোরগঞ্জ শহরের পুর্ব প্রান্তেুর বিস্তিুর্ণ এলাকার নাম শোলাকিয়া। শোলাকিয়া মাঠ এলাকার পুর্ব নাম ছিল ইচছাগঞ্জ। শোলাকিয়া সাহেব বাড়ির পুর্ব পুরূষ শাহ সুফী মরহুম সৈয়দ আহম্মেদ ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমে এ স্থানে সর্বপ্রথম ১টি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে শেষ ভাগে শোলাকিয়া মাঠের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীতে হয়বতনগরের শেষ জমিদার দেওয়ান মোঃ মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সনে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের নামে ২ একর ৩৫ শতাংশ জমি ওয়াকফ দলিল করেন। দলিল মতে ঐ সময়ের আরও ২শ বছর আগে থেকেই এ ঈদগাহে দুটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। সৈয়দ আহাম্মদ সাহেবের পর উত্তরাধিকার সুত্রে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির তৎকালীন জমিদার সৈয়দ মোঃ আবদুল্লাহ ১৮২৯ সন হতে ১৯২১ সন পর্যন্তু এই শোলাকিয়া মাঠে ইমাম ছাড়াও তিনি এই ঈদগাহের সর্বপ্রথম মোতাওয়াল্ল¬ী ছিলেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে হয়বতনগর জমিদার পরিবার থেকে মোতাওয়াল্লী ও তাদের সিদ্ধান্তু মতে ইমাম নিযুক্ত হয়ে আসছে। বর্তমান মোতাওয়াল্লী এই জমিদার পরিবারেরই সদস্য দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আয়তন: বর্তমানে সরকারি খাস জমি নিয়ে প্রায় ৭ একরের উপরে জমি রয়েছে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। ঈদগাহটির চারিপাশে অনুচচ প্রাচীর ঘেরা মাঠে মোট ২৭০টি কাতার রয়েছে। প্রতিটি কাতারে প্রায় ৫শ লোক নামাজ আদায় করেন। সে হিসেবে মাঠের ভিতরেত প্রায় সোয়া তিন লাখ লোক নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মাঠে আশেপাশে রাস্তুা ও বাড়িঘরসহ প্রায় ২ লক্ষাধিক মুসুল্লীর বেশী নামাজ আদায় করে থাকেন। শোলাকিয়া নাম করণের বিভিন্ন জনশ্র“তি: দীর্ঘকাল আগে একবার অংশগ্রহণকারী নামাজির সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ জামাতে অংশ গ্রহণ করেছিল সেই থেকে ঈদগাহ্ মাঠটির নাম সোয়ালাখিয়া। সেই সোয়ালাখিয়া এখন হয়েছে শোলাকিয়া। দ্বিতীয় জনশ্র“তি রয়েছে, আজকের মৃত প্রায় নরসুন্দা নদীটি এককালে ছিল সুগভীর আর বেগবতী। নদীটিতে নিয়মিত বড় বড় নৌযান চলাচল করতো এবং মোঘল শাসনামলে বন্দরটি এদতঞ্চলের বিখ্যাত নৌবন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। একবার বন্দরটিতে সসন্নাসীদের ১৬টি লবণ বোঝাই নৌযান এসে নোঙ্গর করেছিল, তাতে উক্ত লবণ বোঝাই নৌযান থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ যে শুল্ক আদায় করেছিল, সে থেকে উক্ত এলাকাটি উচচারণ বিবর্তনে ক্রমান্বয়ে শুল্ক থেকে শোলাকিয়া নাম প্রচলিত হয়েছিল। তৃতীয় জনশ্র“তি রয়েছে, ইষ্ট ইন্ডিয়ান কো¤পানী আমলে সেখানে নরসুন্দার নদী বন্দর ছিল, তার পাশেই অবস্থিত ছিল ফরাসী বনিকের লবণ ও শুকনা মাছের আড়ত। সে আড়তের জন্য বাইরে থেকে যে লবণ আমদানী ও শুকনা মাছ রপ্তানী করা হতো, তার জন্য কো¤পানীকে বিশেষ শুল্ক দিতে হতো। এর ফলে এ শুল্ক আদায়ে ঘাট থেকে এলাকাটি উচচারণ বিকৃতিতে ক্রমান্বয়ে শোলাকিয়া নামে পরিচিত হয়ে উঠে। চতুর্থ জনশ্র“তি রয়েছে, মোঘল আমলে স্থানীয় এলাকাটিতে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সে অফিসের অধীনে পরগনার রাজস্ব ছিল সোয়ালক্ষ টাকা। সোয়ালক্ষ টাকার রাজস্ব আদায়ের অফিসের উচচারণ বিবর্তনে এলাকাটির নাম রয়েছে শোলাকিয়া। মুসাফির খানা: জানা গেছে, বৃটিশ, পাকিস্তুান ও বর্তমান বাংলাদেশ আমলের গোড়ার দিকেও এ দেশের প্রত্যন্তু জেলাসমুহ ছাড়াও সুদুর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য আসাম, পাকিস্তুান, ভুটান, ইরান, নেপাল, সৌদিআরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানগণ শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদের জামাতে শরীক হতো। সে সময়ে এ ঈদগাহে মুসুল¬ীদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে ভৈরব-টু-কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ-টু-কিশোরগঞ্জ রেলপথে দুটি বিশেষ ট্রেন চালু ছিল। হয়বতনগর হাবিলীতে ঈদের জামাতি হিসেবে অতিথিদের জন্যে মুসাফির খ্যনা নামে একটি বড় আকারের ঘরও ছিল। ঈদের নামাজের ২/৩ আগে থেকেই দলে দলে মুসুল্লূীগন এসে হয়বতনগর হাবিলীসহ ঈদগাহ ও এর আশপাশ এলাকায় অবস্থান নিত। এখন অবশ্য তেমন দেখা যায় না। তবে শহরের বর্তমান হারূয়া এলাকায় ছোট আকারের বেশ কয়েকটি মুসাফির খানা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। মুসুল্লীদের ইফতার ও খাবারের ব্যবস্থা: বেশ কয়েক বছর যাবৎ মাঠ কর্তৃপক্ষ ঈদেও ২/৩ দিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্তু অব্জল থেকে ঈদের জামাতে অংশ নেয়া মাঠে অবস্থানরত হাজার হাজার মুসুল্লীদের ইফতার, রাতের খাবার ও সেহরীর ব্যবস্থা কওে থাকেন। জামাতকে কেন্দ্র কওে বিশেষ মেলা: শোলাকিয়া মাঠে ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে শহরে বিশেষ করে পুরানথানা বাজার এলাকাসহ আশপাশের বিস্তুও এলাকা জোওে বিশাল মেলা বসে। মেলায় কাঠ, ফোম, আধুনিক তৈরি আসবাবপত্র, কাগজ, প্লাশ্টিক ও মাটির তৈরি খেলনা, কসমেটিকসসহ নানা ধরনের পণ্য সাজিয়ে শত-শত দোকান বসে। ঈদেও দিনের আনন্দেও সাথে এ মেলার আনন্দ যোগ হয়ে দর্শনার্থীদেরও মন আরও ভরিয়ে দেয়। কীভাবে শোলাকিয়া আসবেন: ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে আসতে হলে সরাসরি এগারসিন্দুর আন্তুঃনগর (প্রভাতী) ট্রেনে ঢাকায় সকাল ৭.২০ টায় কমলাপুর রেলষ্টেশন থেকে ছেড়ে যায় আবার সন্ধ্যা ৬.১০ এগারসিন্দুর আন্তুঃনগর (গোধুলী) ট্রেন ছেড়ে যায় কিশোরগঞ্জের দিকে। প্রথম শ্রেণীর ১৮০ টাকা, শোভন চেয়ার কোচ ১৪০ এবং সুলভ ১২০ টাকা ভাড়া। তাছাড়া সায়েদাবাদ, গোলাপবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কিশোরগঞ্জের দিকে বিভিন্ন গেইটলক, মেইল ও সিটিং সার্ভিস বাস চলাচল করে। ভাড়া ১০০/১৮০ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে ট্রেন ও বাসযোগে কিশোরগঞ্জ আসা যাবে। কিশোরগঞ্জ শহরে এসে রিকসায় শোলাকিয়া মাঠে যেতে হবে। শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল ট্রেন: শোলাকিয়া এক্সপ্রেস স্পেশাল ট্রেন: পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক মুসুল্লীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে শোলাকিয়া এক্সপ্রেস স্পেশাল ট্রেন নামে তিনটি ট্রেনের ব্যবস্থা করেছেন। ভৈরব-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ভৈরব থেকে ছেড়ে আসবে সকাল ৬টায়, কিশোরগঞ্জ পৌঁছবে সকাল ৮টায়। কিশোরগঞ্জ-ভৈরব (স্পেশাল) কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে দুপুর ১২টায়, ভৈরব পৌঁছবে বেলা ২টায়। আবার অপরদিক থেকে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসবে সকাল ৫.৪৫ মিনিটে, কিশোরগঞ্জ পৌছবে সকাল ৮.৩০ মিনিট। কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ (স্পেশাল) কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে দুপুর ১২টায় ময়মনসিংহে পৌঁছবে বিকাল ৩টায় এবং নরসিংদী-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) নরসিংদী থেকে ছেড়ে আসবে ভোর ৫.৩০ মিনিটে কিশোরগঞ্জ পৌছাবে সকাল ৭.৪৫ মিনিটে। আবার কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে দুপুর ১২টায়, নরসিংদী পৌঁছবে বেলা ২.৩০ মিনিটে। ঈদের জামাত সরাসরি সমপ্রচার: প্রথমবারের মত ২০০৬ সালে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এনটিভি সরাসরি সম্প্রচার করে এ বড় জামায়াতের। এরপর থেকে প্রতিবারই চ্যানেল আই সরাসরি সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এবারও চ্যানেল আই সকাল ০৯টা ৪৫ মিনিট থেকে সরাসরি সম্প্রচার করবে। এছাড়াও  অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স প্রিন্ট  মিডিয়াগুলো বিশেষ খবর প্রকাশ করবে। জামাতের সময় ও শোলাকিয়া মাঠের নিরাপত্তা ব্যবস্থা: জামাত শুরূ হবার ৫মিনিট পুর্বে ৩টি, ৩ মিনিট পুর্বে ২টি, এক মিনিট পুর্বে ১টি বন্দুকের গুলি ফাঁকা আওয়াজ করে নামাজ শুরূর প্রস্তুতির নির্দেশনা দেওয়া হয়। পুলিশ প্রশাসন মাঠে নিরপত্তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এমনকি মাঠের চতুর্পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি করার নেয়া জন্য থাকবে সিসি ক্যামেরা। মাঠের নিরাপত্তা বেষ্টনী পর্যন্তু শুধুমাত্র নামাজী ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না এমনকি ফকির-মিসকিনদের ক্ষেত্রেও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে দেশের সর্ববৃহত ঈদ জামায়াতে মুসুল্লীরা নামাজ আদায় করে মুসলিম উম্মাহ দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দীর্ঘ মোনাজাত করা হয়ে থাকে। সেই মোনাজাতে আপনিও অংশ গ্রহণ করুন ও অপরকে উৎসাহিত করুন।আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করুন। ‘হৃদয়ে কিশোরগঞ্জ’ মানবাধিকার সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মো. এস. হোসেন আকাশের পক্ষ থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আগত মুসুল্লিদেরকে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক রইল।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *