পাখি জামা-তালাক-আত্মহত্যা এবং…..?

787979প্রথম সকাল ডেস্ক: ‘পাখি আছে পাখি, আপু আসেন পাখি জামা দেইখা যান দোকানে ঢুইকা’- ঈদের মার্কেটে নারীদের পোশাকের দোকানের পাশে গিয়ে এমন আমন্ত্রণ নিশ্চয়ই আপনিও পেয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো ভেবেছেন ‘পাখি জামা’ আবার কি জিনিস! আবার কেউ কেউ শুধু পাখি জামার খোঁজেই গিয়েছেন মার্কেটে। ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে বেশ নিরীহ। লং কামিজের একটি বিশেষ ডিজাইনের নাম ‘পাখি’। সুন্দর এই পোশাক গুলো বিক্রি হচ্ছে দোকানে, আর তরুণীরা বেশ ভিড় করেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের পছন্দের জামাটি। এটাই তো ঈদের আনন্দ তাইনা? দোকানে সাজানো পাখি জামা ব্যাপারটা যদি শুধু কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে হয়তো বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন ছিলোনা। কিন্তু সমস্যাটা তখনই যখন শুধুমাত্র একটি পোশাকের জন্য ডিভোর্স কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে। খুব সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা দুটি ঘটনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো ঘটনা ১- ঈদ উপলক্ষে জনৈক সাইদুলের পিতা তোকিম মিয়া তার দুই পুত্র বধূর জন্য ১৪শ টাকা দিয়ে ২টি শাড়ি ক্রয় করে নিয়ে যান। ছোট পুত্র সাইদুলের স্ত্রী শারমিনকে শাড়ি দেখতে বললে তিনি শাড়ি নিবেন না বলে তার স্বামী সাইদুলকে পাখি থ্রি-পিস কিনে দিতে বলেন। সাইদুল তার স্ত্রী শারমিনকে বলেন আব্বা শাড়ি নিয়ে আসছে তুমি এটা নাও, পরে তোমাকে পাখি থ্রি-পিস কিনে দেব। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে শারমিন তার পিতা ও ভাইকে ফোনে ডেকে নিয়ে আসেন এবং গত শুক্রবার বিকালে শারমিন তার স্বামী সাইদুলকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান। শারমিন তালাক দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বলে ঈদের আগেই বিয়ে করে নতুন স্বামীকে সঙ্গে করে পাখি থ্রি-পিস পরে তোমার বাড়ির এলাকা থেকে ঘুরে যাবো। ঘটনা ২- ভারতীয় নামকরণে ঈদে ‘পাখি’ জামা না পেয়ে শিবগঞ্জের কানসাটে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে হালিমা (১২) নামের ষষ্ঠ শ্রেণির এক কিশোরী। বাবার কাছে পাখি জামা কিনে দেয়ার আবদার করার পরও সেটার জন্য বকা খেয়ে অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে হালিমা। কে এই পাখি: এবার আসা যাক ‘পাখি’ প্রসঙ্গে। স্বাভাবিক ভাবেই যারা ভারতীয় সিরিয়াল দেখেন না তাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে ‘পাখি’ কে বা কী। প্রতি সপ্তাহের সোম থেকে শনিবার রাত ৯:৩০ মিনিটে ‘স্টার জলসা’ নামের একটি ভারতীয় বেসরকারী চ্যানেলে ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’ নামের একটি সিরিয়াল প্রচারিত হয়। কলকাতা সহ বাংলাদেশেও সিরিয়ালটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। আর এই মেগাসিরিয়ালের প্রধান চরিত্রের নায়িকার নাম-‘পাখি’। আর সিরিয়ালের নায়িকা পাখি নাটকে যেই ধরণের পোশাকগুলো পড়েছেন সেই ধরণের পোশাকগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ‘পাখি জামা’। যেভাবে নারী সমাজকে ধ্বংস করছে ভারতীয় এই সিরিয়ালগুলো: একটা সময় ছিলো যখন ঈদের পোশাক বলতে বাঙালি নারীরা ঐতিহ্যবাহী কাতান, জামদানী, সুতি তাঁতের শাড়িকেই বোঝাতো। ধীরে ধীরে বাঙালি নারীর পোশাকের তালিকায় কামিজ এসেছে। কিন্তু তখনও দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর জয়জয়কার ছিলো। আর এখন ঈদের পোশাক মানেই ভারতীয় সিরিয়ালের নায়িকা অথবা সিনেমার নায়িকার নামের নানান রকমের পোশাক। পাখি, মাসককালি, কারিনা, দীপিকা, সাঞ্জু, ক্যাটিরিনা, আয়েশা টাকিয়া, কারিশমাসহ আরো নানান মন ভোলানো নামে চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয় এসব পোশাক। নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত বাবা কিংবা স্বামীদের হিমশিম খেতে হয় স্ত্রী/কন্যার এসব আবদার মেটাতে। ভারতীয় সিরিয়ালের প্রভাবটা শুরু হলো প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ভারতীয় চ্যানেলগুলো পৌঁছানোর পর থেকেই। ভারতে আমাদের কোনো চ্যানেল দেখানো হয়না কিন্তু আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি বেডরুমেই ঢুকে পড়েছে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো। এক একটা সিরিয়াল দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদেরকে মন্ত্র মুগ্ধের মতো করে ধরে রাখা শুরু করলো। সিরিয়ালের নায়িকাদের গ্ল্যামার, দামী দামী পোশাক, খোলামেলা চালচলন আর ঘটনার নানান মোড় বাঙালি নারীদেরকে আকৃষ্ট করে নিলো চুম্বকের মতো। ফলে দেশীয় সংস্কৃতি ও দেশীয় চ্যানেল গুলোর আবেদন ধীরে ধীরে কমে যাওয়া শুরু করলো প্রতিটি ঘরের মা, বোন, স্ত্রীদের কাছে। সমাজটাও কলুষিত হয়ে গেলো খুব দ্রুত। আর তার ফলাফল হলো সামান্য একটি পোশাকের জন্য তালাক কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া। সমাধান কি আছে: সমাজটাকে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো এতোটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে এই অবস্থার কোনো সমাধান আদৌ আছে কিনা এটা নিয়ে দ্বিধা তৈরী হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিস্থিতি যতই দিন যাবে ততই আরো বেশি সমস্যায় ফেলে দেবে সমাজকে। নৈতিকতা বলে আর হয়তো কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এখন ঈদের আগে ‘পাখি জামা’ নিয়ে একটি দুটি ঘটনা ঘটছে। ভবিষ্যতে হয়তো অনেক বেশি ঘটবে। সমাজটাকে হয়তো এভাবেই কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলবে ভারতীয় এসব সিরিয়াল।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *