গাইবান্ধার চরাঞ্চলে ডাকাত আতঙ্কে পাহারা

gai123-345x230-300x200প্রথম সকাল ডেস্ক: ফুলছড়ি উপজেলার উজান ডাঙ্গা, কোচখালী, মানিক কর, কাউয়াবাদা, চর খাটিয়ামারীসহ গাইবান্ধার চার উপজেলার চরাঞ্চলে এখন ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করছে। ডাকাতদের হাত থেকে গবাদী পশু ও সহায়-সম্বল বাঁচাতে রাত জেগে চরগুলোতে পাহারা বসিয়েছেন এলাকার মানুষ। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী জনপদগুলোতে ডাকাতদের উপদ্রব শুরু হয়েছে। গৃহপালিত গরু-ছাগলই এসব ডাকাতদের প্রধান টার্গেট। সুযোগ বুঝে কেড়ে নিচ্ছে অন্যান্য সম্বলও।গাইবান্ধার বালাসীঘাট। ঘড়ির কাটা তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার কাছাকাছি। ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। এপারে কেনাকাটা শেষে নদীর ওপারে ফেরার পালা। চরের মানুষজন নৌকার দিকে ভিড়তে শুরু করেছেন। যার যার সদাই নিয়ে সবাই নৌকায় ওঠার পর ৭টার ১৫ মিনিট আগে ফজলুপুরের উজানডাঙ্গার নৌকা ছাড়লো মাঝি। ব্রহ্মপুত্রর মাঝপথে ইফতারের আযান। নৌকার মধ্যেই ইফতার করলেন যাত্রীরা। নৌকায় দুই বৃদ্ধ আলাপ করছেন, ‘কয়েকরাত হলো দুই চোখের পাতা এক করতে পারি না ভাই। সবাই মিলে লাঠিসোটা নিয়ে গল্পে গল্পে রাত কাটাই। কখন ডাকাত পরে সেই ভয়ে ঘুম আসে না। দুই জনের গল্পের মাঝে ঢুকে পড়ে পাশে বসা মহির উদ্দিন (২২)। বললেন, ‘চাচা আর কন না, এই তো পয়লা রোজার রাতে পাশের চর থাইক্যা দুই জনের ১৪ ডা গরু নিয়া গেছে। তাদের গল্পের প্রতি মনোযোগ দেখে মহিরউদ্দিনের জিজ্ঞাসা ‘আপনি ক্যাডা’। সাংবাদিক পরিচয় শুনে বললেন, ‘বাই এই অভাগাগোর কতা কেউ শোনে না। চেয়ারম্যান কন মেম্বর কন কেউ হামার খ্যোঁজ নেয় না। হামরা তো ইলিপ চাইনা বাই, ডাকাতিডা বন্ধ করুক তাতেই হামরার শান্তি। ‘এই যে সেদিন কাউয়া বাদা চরে বকর মিয়া আর ময়নালের ১৪ডা গরু নিয়্যা গেলো। ডাকাতগো কাছে হাতের (অস্ত্র) আছে গো বাই তাই আমগো আরো বেশি ডর লাগে।’ ততক্ষণে নৌকা থেকে নামার সময় হয়ে গেছে। চারিদিকে অন্ধকার। উজানডাঙ্গা ঘাটে নামার পর কয়েক গজ দূরে যেতেই একের পর এক টর্চের আলো। সবার হাতে হাতে লাঠি, কারো হাতে দা, ছোড়া, বটি। ডাকাত ঠেকাতে সবাই মিলে পাহারা বসিয়েছেন। কাউকে অপরিচিত ঠেকলে জিঙ্গাসাবাদ করছেন। সেখান থেকে আবার নৌকা করে মানিককর ও কাউয়াবাদা চরে গিয়েও দেখা গেল একই চিত্র। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলেন কাউয়াবাদা চরের মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর সিদ্দিক (৬২)। ‘বা গো আমার সোগ শ্যাষ বা গো। হামাক শেকের বেটি হাসিনার কাচে নিয়্যা যাও দুক্কের কতা তাকে কমো। পহেলা রমজানের রাতে দুই নৌকায় করে সশস্ত্র ডাকাত দল তার বাড়ির পাশে নৌকা থামিয়ে গোয়ালঘর থেকে জোর করে ৬টি গরু, ৩টি ছাগল ও ৫টি ভেড়া নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে তাকে বেদম মারপিট করে ঘরে থাকা টাকা পয়সা যা ছিলো সব নিয়ে যায়। বার বার অনুরোধ করেও ডাকাতদের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়পত্র ও ভোটার আইডি কার্ডটি ফেরৎ পান নি বক্কর। এঘটনায় ফুলছড়ি থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে পরিচয় পত্র দু’টি হারিয়ে গেছে বলে থানায় জিডি নেয়।
একই রাতে পাশের বাড়ির ময়নাল মিয়াকে বেঁধে রেখে ৮টি গরু, ছাগল ও টাকা পয়সা নিয়ে যায়। ময়নাল মিয়ার স্ত্রীকেও জোর করে নৌকায় তোলার চেষ্টা করে ডাকাতরা। উজানডাঙ্গা চরের সমাজকর্মী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকাতির সাথে পুলিশ এবং সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ সম্পৃক্ত থাকায় ডাকাতদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। চরের বাসিন্দা শফি মিয়া জানালেন, শুধু কাউবাদা চর বা মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর নয় গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে দিনে-রাতে ডাকাতদের অবাধ বিচরণ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। কোন মহল থেকে সহযোগিতা না পেয়ে বাধ্য হয়ে নিজেরাই ডাকাত প্রতিরোধে নেমেছেন তারা। রাত জুড়ে চরে চরে লাঠিসোটা নিয়ে পালাক্রমে সবাই পাহারা দিচ্ছেন। কোচখালী চরের জাহাঙ্গীর মিয়া জানান, কয়েকবার নদী ভাঙ্গনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পর তারা গরু-ছাগল লালন পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গরুই চরের মানুষের একমাত্র সম্বল। তিনি বলেন, ‘কষ্টকরে লালন পালন করার পর ডাকাতরা যদি এভাবে সব ছিনিয়ে নেয় তবে চরের মানুষদের বাঁচার আর কোন উপায় থাকবে না। ডাকাতির অভিযোগ না নেয়ার কথা অস্বীকার করেন ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘ডাকাতি রোধে পুলিশি টহল জোরদারের পাশাপাশি মানুষকে সংগঠিত ও সচেতন করা হচ্ছে। নৌ-যান, তেল ও জনবলসহ বিভিন্ন সঙ্কটের কারণে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হলেও পুলিশ থেমে নেই। চরের দোকানি আজিজ মিয়া বলেন, ‘দফায় দফায় ভাঙনে সবহারা এসব মানুষের খেয়েপড়ে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন গরু। তাদের সেই গরুর উপর চোখ পড়েছে দুর্বৃত্তদের। নৌকা ঠেকিয়ে দিনে মাঠ থেকে আর রাতে গোয়াল শূন্য করে চলে যাচ্ছে ডাকাতরা। ডাকাতের ভয়ে মানুষ আর পশু এক কাতারে বাস করলেও তাদের নিস্তার মিলছে না। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সাথে ডাকাতদের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে জেলা পুলিশ সুপার মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘এক চরের সাথে আরেক চরের মানুষের বিরোধের কারণেই এসব ঘটনা ঘটে। তারপরও ডাকাতি রোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার বুকে ১শ’ ৬৫টি চর রয়েছে। এসব চরে প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *