নিরাপত্তাহীন ডাক্তার : ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ

ডা. মুহসিন আব্দুল্লাহ, ঢাকা : কয়েকদিন পরেই বিদেশ যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু চোখের সামনে একটা মেয়েকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নিয়ে যাবে, আর তিনি নিজের কথা ভেবে চুপ থাকবেন তার বিবেক এটা মানতে পারেনি। নিজের বিপদকে উপেক্ষা করে বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন নিরাপত্তা কর্মী লিটন। সন্ত্রাসীরা গুলি করলো তার বুকে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন লিটন। এটি কয়েকদিন আগে ঢাকার উত্তরায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। লিটনের সাহসিকতা ও মানবতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি অন্যখানে। একটি দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্ট এসেছে- লিটনকে স্থানীয় দুইটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে, পুলিশি হয়রানির ভয়ে তার চিকিৎসা দেয়া হয়নি। ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়েছিল। ফলে বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন এই সাহসী পরোপকারী মানুষটি। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির ভয়। বিষয়টি আসলেই ভয়ংকর। ডাক্তাররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে, চিকিৎসাক্ষেত্রে নিজেকে অনিরাপদ বোধ করলে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতি যে সাধারণ জনগণেরই সেটা আবারো স্পষ্ট হয়েছে এই ঘটনায়। অবশ্য ওই ক্লিনিকে এরকম রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কিনা সেটা একটা বিবেচ্য বিষয়। কারণ, গুলিতে গুরুতরভাবে আহত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে রেফার করা ছাড়া উপায় নেই। মুমূর্ষু রোগী বাঁচতেও পারেন, মারাও যেতে পারেন। ডাক্তারের কাজ হলো বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, কোনোভাবে রোগী মারা গেলেই ডাক্তারের ওপর চড়াও হওয়া, হাসপাতাল ভাঙচুর করা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনোরকম তদন্ত কিংবা মামলা ছাড়াই পুলিশ ডাক্তারকে গ্রেফতারও করেছে। ডাক্তারদের কমুনিটিতে এসব সংবাদ এখন খুব দ্রুত ছড়ায়। ফলে ডাক্তাররাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে ঝামেলা এড়াতে চাচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও ঝামেলা এড়ানোর জন্য খারাপ রোগী রেফার করতে ডাক্তারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। হাসপাতালের মালিকরা আসলে ব্যবসায়ী। ব্যবসা তাদের মূল লক্ষ্য। অবহেলা যে একেবারে কোথাও হয় না তা নয়। তবে তার দায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তারের চেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই বেশি। যার স্বজন মারা যায় সেই বোঝে স্বজন হারানোর কষ্ট। কিন্তু তার মানে এই নয় ডাক্তাররা কষ্ট পায় না। রোগীকে সুস্থ করতে না পারলে ডাক্তারেরও কষ্ট লাগে। তারপরও ডাক্তার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি নিরাপত্তাহীন বোধ করেন তাহলে তারা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসা দিতে চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন আছে। এছাড়া ভয় আছে পুলিশি ঝামেলার। এরকম ক্রিমিনাল অফেন্সে কখনো কখনো ডাক্তারদের সাক্ষী বানিয়ে টানা হেঁচড়া করা হয়। সেটাও ডাক্তারদের জন্য অহেতুক ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এখন ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা প্রতিরোধের জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও প্রশাসনিক লোকের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠিত হোক। কিন্তু ডাক্তাররা নিরাপত্তাহীনতাবোধ করলে, শেষমেশ আমাদেরই ক্ষতি হবে। আমাদের মূর্খতার কারণে আর কোনো লিটন যেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন। কোনো লিটনের চিকিৎসা দিতে ডাক্তাররা যেন ভয় না পান।

 

This website uses cookies.